kalerkantho


নারী সহিংসতা

রিকশায় প্রতিবাদের ভাষা

রফিকুল ইসলাম   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



রিকশায় প্রতিবাদের ভাষা

পুরান ঢাকার নিমতলীতে রিকশার পেছনে নারী নিগ্রহের প্রতিবাদী ভাষা তুলির আঁচড়ে তুলে ধরছেন ‘মেয়ে’র সদস্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজপথ থেকে সরু গলি—সবটাই এখন বলতে গেলে মোটরযানের দখলে। শহর-নগর ছাড়িয়ে পিচের প্রলেপ পড়ছে গাঁয়ের পথেও। সেখানেও পাল্লা দিয়ে ছুটে চলছে দ্রুতগতির যন্ত্রযান। স্বভাবতই মনুষ্যচালিত যান প্রভাব হারাচ্ছে। ব্যতিক্রম শুধু রাজধানী ঢাকা। এখানে মোটরযানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে মনুষ্যচালিত এই যান। সংখ্যাটাও বোধ করি হিসাব ছাড়িয়ে।

খুব বেশি দিনের কথা নয়, রাজধানী ঢাকাকে বলা হতো রিকশার শহর। রাজপথে সেগুলো চলত রাজসিক ভঙ্গিতে গায়ে বাতাস লাগিয়ে। আর সেসব রিকশার সঙ্গে শহরময় ঘুরে বেড়াত গ্রামবাংলার প্রকৃতিও। এই ত্রিচক্রযানের পেছনের দিকের বড় অংশটা জুড়ে থাকত সবুজঘেরা কোনো গাঁয়ের ছবি, নয়তো নদীর। একসময়ে সেই জায়গাটা দখল করে নেয় বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের ছবি।

রিকশার পেছনে স্থায়ীভাবে ছবি জুড়ে দেওয়াটা ছিল অনেকটা সিনেমার বিজ্ঞাপনের মতো। কারণ উদ্যোক্তারাও জানত, রিকশার গড়পড়তা আরোহীদের বড় একটা অংশ বাংলা চলচ্চিত্রের মূল দর্শক। তেমন ধারণা থেকেই এবার নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদ জানাতে বেছে নেওয়া হলো রিকশাকে। ‘রিকশা রাঙায় প্রাণের কথায়’ স্লোগানে এমন অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে নারীদের একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘মেয়ে’।

‘মেয়ে’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকভিত্তিক একটি গ্রুপ, যার মাধ্যমে নারীরা যেকোনো বিষয়ে নিজেদের মতামত ও ধারণা বিনিময় করে। গ্রুপটি গতকাল শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে এশিয়াটিক সোসাইটির সামনে নিমতলী গেটে রিকশা পেইন্টের মাধ্যমে এই কর্মসূচি পালন করে। রিকশার পেছনে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নানা স্লোগান পেইন্ট করে অপেশাদার শিল্পীরা।

দিনভর আয়োজনে মালিকদের পক্ষ থেকে দেওয়া ছয়টি রিকশায় পেইন্ট করা হয়। এই উদ্যোগে রং সরবরাহ করেন রিকশা মালিকরা। সঙ্গে তুলি নিয়ে আসা অর্ধশতাধিক নারী এই রংবাজিতে অংশ নেন। রিকশায় অঙ্কনের মাধ্যমে তাঁরা ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ নারী পুরুষ সবাই সাথে’, ‘লজ্জা ধর্ষকের, ধর্ষিতের নয়’, ‘ঘরের কাজ ফেলনা নয়, বাইরের কাজ খেলনা নয়’ ইত্যাদি বক্তব্য তুলে ধরেন।

আয়োজকদের বক্তব্য, দেশব্যাপী নারীর প্রতি একের পর এক সহিংসতার নীরব প্রতিবাদ এই কর্মসূচি। রিকশা আমাদের নাগরিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। রিকশা পেইন্টে সমাজচিত্রও উঠে আসে। কাজেই রিকশার পেছনে কোনো বার্তা দেওয়া হলে চলাচলের সময় কিংবা যানজটে আটকে থাকার সময়ও তা পথচলতি সাধারণ মানুষের চোখে পড়বে। অনেকে মানববন্ধন কিংবা সমাবেশের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদ করছে। আমাদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ সব মানুষের কাছে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের বার্তা পৌঁছে দেবে। কারণ এককভাবে কেউ নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করতে পারবে না। রিকশাওয়ালা ও দিনমজুর থেকে শুরু করে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

আয়োজকদের একজন তৃষিয়া নাশতারা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা ও সম্প্রতি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ এই রিকশা পেইন্টিং। এই কর্মসূচিতে আমরা নিজের হাতে রিকশায় ফুটিয়ে তুলছি নিজেদের প্রাণের কথা, প্রতিবাদের ভাষা। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের এটি সূচনা মাত্র। এই কর্মসূচিকে ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। আর এই উদ্যোগে যে কেউ যেকোনো সময় যোগ দিতে পারে। তাতে প্রতিবাদের এই উদ্যোগ আরো গতিশীল হবে। ’


মন্তব্য