kalerkantho


ইয়াবা পাচারে জাপার মনোনয়ন প্রত্যাশী অরুণ!

♦ বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে প্যাকেট বদল
♦ পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেই

এস এম আজাদ   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ইয়াবা পাচারে জাপার মনোনয়ন প্রত্যাশী অরুণ!

অরুণ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেলে ইয়াবা ট্যাবলেট পাচার করছেন জাতীয় পার্টির এক ‘নেতা’। জিন্স প্যান্ট ও জুতার পার্সেলে কৌশলে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৫ আসনের (বুড়িচং) জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী মো. শাফিকুল ইসলাম অরুণ (৪০)। তবে তিনি দলীয় কোনো পদে আছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁকে প্রায়ই দেখা যায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে। কুমিল্লা জেলা জাতীয় পার্টির নেতারা জানান, অরুণ জেলায় দলের কোনো পদে নেই। তিনি ঢাকায় রাজনীতি করেন এবং নিজেকে তরুণ পার্টির নেতা বলে দাবি করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অরুণ ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজ করেন বলে জানে সবাই। এরই মধ্যে তিনি স্ত্রী-সন্তানকে যুক্তরাষ্ট্রে রেখে এসেছেন। নিজেও যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) তথ্য দিয়েছে, চলতি বছরই ইয়াবার পাঁচটি চালান গেছে সে দেশে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসি বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ এলাকা থেকে ইয়াবার দুটি চালান জব্দ করেছে। দুটি ঘটনায়ই প্যাকেটে জুতার ভেতরে লুকানো ছিল এক হাজার পিস ইয়াবা। সেই চালানের সূত্র ধরে দুজনকে গ্রেপ্তারও করে ডিএনসি। চালান ধরার পরই গা ঢাকা দিয়েছেন অরুণ।

তবে এই ইয়াবা পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করার কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। এরই মধ্যে ইয়াবা চালান ধরা পড়ায় অভিযানের তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালায় কালের কণ্ঠ। এতে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ এলাকায় কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীরাও ইয়াবা পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। কার্গো ভিলেজের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের একাধিক ছবি কালের কণ্ঠের কাছে এসেছে। তাতে দেখা যায়, ওই চালানের প্যাকেটে জুতা ঢোকানো হচ্ছে এবং প্যাকেট বদল করা হচ্ছে।

ডিএনসির পরিচালক (অপারেশন) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জানি না এমন আর চক্র আছে কি না, তবে একটি গ্রুপকে আমরা শনাক্ত করেছি। পার্সেল এজেন্টকে গ্রেপ্তারের পর কিছু তথ্য পেয়েছি। এক ব্যক্তি ডিএইচএল ও সিইএক্স কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কৌশলে চালান দুটি পাঠায়। ’

অরুণ সম্পর্কে সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি নাকি জাতীয় পার্টির নেতা। তাঁকে ধরার জন্য আমি তদন্তকারীদের বলেছি। তবে আমরা সেভাবে অভিযান চালাতে পারিনি। এখানে আরো লোকজন থাকতে পারে। বিমানবন্দরে পার্সেলের প্যাকেট বদল হয়েছে। জুতার প্যাকেট বাংলাদেশ থেকে এভাবে পার্সেলে যায় না, এটা সংশ্লিষ্টদের দেখার কথা ছিল। ’

ডিএনসির অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, ‘ডিইএর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই দুটি চালান আটকানো গেছে। তবে এর আগে ইয়াবার তিনটি চালান নাকি গেছে, যেগুলো আমাদের দেশ থেকে পাঠানো হয়েছে। তবে তথ্য পেয়েই দ্রুত অ্যাকশনে যাই আমরা। ’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইয়াবা পাচারকারী অরুণের বাবার নাম মো. আব্দুর রউফ। কুমিল্লার বুড়িচং কলাকচুয়া ঘোষ নগর এলাকায় তাঁর বাড়ি। অরুণ যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে ভিসা প্রসেসিংয়ের আড়ালে ইয়াবা পাঠানোর কাজ করেন। কুমিল্লার ময়নামতি এলাকায় তিনি বাড়ি করছেন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এলাকায় জানাজানি হয় অরুণ জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কুমিল্লা-৫ আসন (বুড়িচং) থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেতে তিনি ব্যাপক হারে প্রচারও চালান। তবে শেষ পর্যন্ত দলের টিকিট পাননি তিনি। প্রায় এক বছর আগে স্ত্রীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান অরুণ। সেখানে তাঁর স্ত্রী এক সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ফলে ওই সন্তান জন্মসূত্রে সেখানকার নাগরিক হয়েছে। স্ত্রী-সন্তান সেখানে থাকলেও দেশে আসা-যাওয়া করছেন অরুণ। মালয়েশিয়ায় তাঁর যাতায়াত সবচেয়ে বেশি।

জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বলেন, ‘অরুণ মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তিনি জেলায় দলের কোনো পদে নেই। ’ বুড়িচং উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কাজী নূরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনের আগে অরুণ কয়েক দিন দৌড়ঝাঁপ করেছেন। তিনি নাকি ঢাকায় রাজনীতি করেন। নিজেকে তরুণ পার্টির নেতা বলে দাবি করেন। তবে এলাকায় রাজনীতি করেননি কখনোই। ’

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এক মাস ধরে বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন অরুণ। ইয়াবা পাচারের মামলার পরও তিনি প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে ঢাকায় তাঁর বাসার ঠিকানা পাওয়া যায়নি। অরুণের দুটি ফোন নম্বর সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও এসব নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করে বন্ধ পাওয়া গেছে।

ডিএনসির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, প্রধান আসামি অরুণকে গ্রেপ্তার করা গেলে ঘটনার আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে।

প্রথম দফায় ২২ জানুয়ারি বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। গত ৬ ফেব্রুয়ারি একই থানায় মামলা করে ডিএনসি। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, অধিদপ্তরের ধানমণ্ডি সার্কেলের পরিদর্শক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘অরুণের ঢাকার ঠিকানা পাইনি। জাতীয় পার্টির অফিসে কয়েকবার তাঁকে ধরতে গিয়েছিলাম; কিন্তু পাইনি। গ্রামের বাড়ির এলাকাসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় বার্তা পাঠানো হয়েছে। ’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিদেশে যেন পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য বার্তা পাঠানো হয়েছে। ’

ডিএনসির কুমিল্লা উপ-অঞ্চলের উপপরিচালক মাঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘শফিকুল ইসলাম অরুণ নামে এক আসামি পলাতক আছে বলে আমাদের মেসেজ দেওয়া হয়েছে। সে তো ঢাকায়। তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে ঢাকায়। ’

জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের সামনে কুরিয়ার ইয়ার্ডের পাশে ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিসের খাঁচার দক্ষিণ পাশে পড়ে থাকা অবস্থায় একটি পলিথিনে মোড়ানো পার্সেল উদ্ধার করেন ডিএনসির কর্মকর্তারা। ওই পার্সেলটিতে কোরেক্স কুরিয়ার সার্ভিসের নাম লেখা ছিল। পার্সেলের ভেতরে দুটি জিন্সের প্যান্ট ও এক জোড়া চামড়ার স্যান্ডেল পাওয়া যায়। এই স্যান্ডেলের নিচে লুকানো অবস্থায় ছিল এক হাজার পিস ইয়াবা। গত ২২ জানুয়ারি একই রকম আরেকটি চালান জব্দ করে ডিএনসি। ওই প্যাকেটটি ছিল ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিসের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুটি চালান একই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায়ই দুবাই হয়ে সৌদি আরবে পাঠানো হয়, যা পরে ফেরত আসে। ডিইএর তথ্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে দুবাই হয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবার চালান পাঠানো হচ্ছে। কঠোর নজরদারির কারণে ওই দুটি চালান হাতবদল হয়নি। গ্রাহক গ্রহণ না করায় সেগুলো ফেরত আসে। মূলত ওই তথ্যের ভিত্তিতে চালান জব্দ করে ডিএনসি।

সূত্র মতে, দ্বিতীয় দফার চালান জব্দ করতে গিয়ে বেকায়দায় পরেন ডিএনসির কর্মকর্তারা। তখন সিইএক্স কুরিয়ার সার্ভিসের প্যাকেটটি ডিএইচএলের প্যাকেটে ঢোকানো হয়। এতে চালানটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমানবন্দর কার্গো ভিলেজের চক্র জড়িত। গত ৭ জানুয়ারি কার্গো ভিলেজ এলাকার বুকিং সেন্টারের সামনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও প্যাকেট বদল করার দৃশ্য ধরা পড়ে। তবে যারা এই কাজটি করছিল তাদের শনাক্ত করা যায়নি। এই ঘটনার তদন্তে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে জানতে কার্গো ভিলেজের মহাব্যবস্থাপক আলী আহসানের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।


মন্তব্য