kalerkantho


অতিরিক্ত ফি ফেরতের নির্দেশ আরো ৫৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে

শরীফুল আলম সুমন   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



অতিরিক্ত ফি ফেরতের নির্দেশ আরো ৫৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে

রাজধানীর ৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত সেশন চার্জ ও টিউশন ফি ফেরত আজও দেয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৫ এপ্রিলের মধ্যে অতিরিক্ত ফি ফেরত দিতে অথবা এপ্রিল মাসের বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর।

এরপর থানা শিক্ষা কর্মকর্তারা আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে এ নির্দেশনার অগ্রগতি লিখিতভাবে জেলা শিক্ষা অফিসকে জানাবেন। আর শিক্ষা অফিস ১৩ এপ্রিলের মধ্যে মাউশি অধিদপ্তরকে তা লিখিতভাবে জানাবে। গত মঙ্গলবার থানা শিক্ষা অফিসাররা তাঁদের আওতাধীন অতিরিক্ত ফি আদায় করা স্কুলগুলোকে এ নির্দেশনা জানিয়ে দিয়েছেন।

জানা যায়, ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ফি নিয়েছিল বলে মাউশি অধিদপ্তর বেশ আগেই একটি তালিকা করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আরো ৫৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম। এসব প্রতিষ্ঠানকেই নতুন করে বাড়তি টাকা ফেরত দেওয়া অথবা সমন্বয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে অতিরিক্ত সেশন চার্জ ও টিউশন ফি ফেরত দেওয়ার এই নতুন নির্দেশনা দেওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে স্কুলগুলোর মধ্যে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, বেসরকারি স্কুল-কলেজ ভর্তি নীতিমালা-২০১৫ অনুযায়ী আংশিক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেশন চার্জ হিসেবে সর্বমোট ৯ হাজার টাকা নিতে পারবে। যেসব স্কুল আগে সেশন চার্জ কম নিত তারা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সেশন চার্জ বাড়ালেও তাদেরও ‘বাড়তি টাকা’ ফেরত দিতে বলা হয়েছে।

আবার যেসব স্কুল যৌক্তিকভাবে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত টিউশন ফি বাড়িয়েছে তাদেরও ফেরত দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ নীতিমালায় বলা হয়েছে, পরিচালনা কমিটি বেসরকারি স্কুলের টিউশন ফি নির্ধারণ করবে। তাহলে যারা যৌক্তিকভাবে সেশন চার্জ ও ফি বাড়িয়েছে তাদের টাকা ফেরত দিতে বলে অধিদপ্তর নিজেই নীতিমালা ভঙ্গ করেছে।

মাউশি সূত্র জানায়, হঠাৎ করেই টিউশন ফি দ্বিগুণ বাড়ানোর প্রবণতা চলতি বছরই প্রথম লক্ষ্য করা গেছে। তাই এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কেও নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে। তবে এই বছরে যেহেতু ভর্তি শেষ হয়ে গেছে, তাই আগামী বছর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে সেশন চার্জের মতো টিউশন ফির সিলিংও নির্ধারণ করে দেবে মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে মাউশি থেকে একটি প্রস্তাবনাও পাঠানো হয়েছে। আগামী ভর্তি নীতিমালায় এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।

এসব বিষয়ে মাউশি অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মো. এলিয়াছ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এপ্রিল মাসের বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত টিউশন ফি সমন্বয় করতে হবে। এটাই সর্বশেষ সময়। তবে যারা অতিরিক্ত সেশন চার্জ নেয়নি বলে মনে করছে, তারাও তা লিখিতভাবে জানাবে। তবে টিউশন ফি কোনোমতেই গত বছরের চেয়ে বেশি নেওয়া যাবে না। বাড়তি নেওয়া ফি ৫ এপ্রিলের মধ্যেই ফেরত বা সমন্বয় করতে হবে। আমরা জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে এ বিষয়ে লিখিত পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়কে জানাব। তারাই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর টিউশন ফির ব্যাপারে যেহেতু নীতিমালায় কিছুটা ফাঁক রয়েছে, আগামী বছর থেকে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে আমরা মন্ত্রণালয়কে আমাদের প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। ’

ঢাকা বোর্ডের তদন্তে দেখা যায়, রাজধানীর ধানমণ্ডির ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল আগে সেশন চার্জ নিত ৫০ হাজার টাকা এবং মাসিক বেতন ছিল ছয় হাজার টাকা। কিন্তু এবার তারা সেশন চার্জ নিয়েছে ৬০ হাজার টাকা এবং মাসিক বেতন নিচ্ছে ১০ হাজার টাকা। ঢাকা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ আগে সেশন চার্জ নিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং বেতন নিত এক হাজার ৫০০ টাকা। এখন নিচ্ছে যথাক্রমে ১৫ হাজার ৬০০ টাকা ও দুই হাজার ৫০০ টাকা। জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাই স্কুল আগে ১৫ হাজার টাকা সেশন চার্জ নিলেও এবার থেকে নিচ্ছে ৩০ হাজার টাকা। মাসিক বেতনও দুই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার ৭০০ টাকা করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান নীতিমালার চেয়েও অতিরিক্ত সেশন চার্জ নিচ্ছে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান নীতিমালার মধ্যেই রয়েছে তাদেরও ‘বাড়তি’ ফি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে আগে সেশন চার্জ ছিল পাঁচ হাজার টাকা এবং মাসিক বেতন ছিল ৫০০ টাকা। তারা চলতি বছর থেকে সেশন চার্জ ৫০০ টাকা ও টিউশন ফি ২০০ টাকা বাড়িয়েছে। ভাষানটেক উচ্চ বিদ্যালয়ের টিউশন ফি ছিল ৩৬৫ টাকা, তা থেকে তারা মাত্র ৮৫ টাকা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয় টিউশন ফি ৩২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করেছে। আদাবরের আইডিয়াল স্কুল ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করেছে। করাতিটোলা সিএমএস মেমোরিয়াল হাই স্কুল মাসিক বেতন ৩৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করেছে। কদমতলীর সমীরন নেছা উচ্চ বিদ্যালয় ২৮০ টাকা থেকে বেতন বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা করেছে। তাদেরও এই ‘অতিরিক্ত’ টাকা সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে কিশলয় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ্ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি তিন-চার শ টাকা ছিল। তারা সেখান থেকে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়িয়েছে। তাদের এখন টাকা ফেরত দিতে হবে। আর যাদের বেতন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা ছিল তারা কিন্তু বাড়ায়নি। তাই তাদের ফেরতও দিতে হচ্ছে না। এটা কি ন্যায়বিচার? আমার প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়ানোয় অভিভাবকদের কোনা প্রতিবাদ নেই। আমাদের গভর্নিং বডিতে অভিভাবক প্রতিনিধি আছেন। তাঁদের সম্মতি পাওয়ার পরই আমরা ফি বাড়িয়েছি। তারা তিন মাস ধরে নতুন বেতন দিচ্ছে তার পরও ফেরত দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে এখন আমাদের ব্যয় কিভাবে নির্বাহ করব। যেসব প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের অভিযোগ ছিল সেসব প্রতিষ্ঠানেই ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া উচিত ছিল। অথবা সরকারের উচিত এখনই টিউশন ফির সিলিং নির্ধারণ করে দেওয়া। ’

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা বোর্ড অতিরিক্ত ফি নেওয়া যে ৫৫ প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, সেসবের সব প্রতিষ্ঠানে তারা সশরীরে যায়নি। বেশির ভাগেই টেলিফোনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাই যেসব প্রতিষ্ঠানে সামান্যই ফি বাড়ানো হয়েছে এবং অভিভাবকদেরও কোনো অভিযোগ নেই তাদেরও টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, অতিরিক্ত ফি নেওয়া যে ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুরুতেই চিহ্নিত করা হয়েছিল, ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি ‘বাড়তি’ টাকা শিক্ষার্থীদের ফেরত দিয়েছে বা বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। আর যারা এখনো কাজটি করেনি তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নতুন করে তালিকায় যোগ হওয়া ৫৫ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই নেওয়া হবে।  


মন্তব্য