kalerkantho


সিরাজগঞ্জ

ভোটাররা লাইনে থাকতেই শেষ ব্যালট পেপার!

তৈমুর ফারুক তুষার ও অসীম মণ্ডল, সিরাজগঞ্জ থেকে   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ভোটাররা লাইনে থাকতেই শেষ ব্যালট পেপার!

মাত্র বছর তিনেক আগেই ভোটার হয়েছেন সিরাজগঞ্জ সদরের খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের তরুণ নজরুল ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে তিনি চর ব্রাহ্মণগাঁতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারেন, চেয়ারম্যান পদের ব্যালট পেপার শেষ। ভোট দিতে চাইলে সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে দিতে হবে। প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে নজরুল তবু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু  খানিকক্ষণ পরই তাঁকে আশাহত করে একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার জানান, আর ভোট নেওয়া হবে না, কারণ সব ব্যালট শেষ। বিকেল ৩টার দিকে ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নিজের এমন অভিজ্ঞতার কথা জানান নজরুল। তিনি বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনও ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট না দিয়েই ফিরে যেতে হয়েছিল। কেন্দ্রে এসে জানতে পেরেছিলেন, তাঁর ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে।

নজরুলের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর পাশে থাকা শফিকুল, ইসমাইল, সাইফুল এবং আরো পাঁচ-ছয়জন জানান তাঁরাও ভোট দিতে পারেননি। বেশ কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখে তাঁদের বলা হয় ব্যালট শেষ। ওই সময় সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ-আনসারসহ চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রাশেদুল হাসানের সমর্থকরা লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয়। অনেক নারীও ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ভোটারদের এমন অভিযোগ সত্য নয়।

সিরাজগঞ্জ সদরের ৯টি ইউনিয়নের আটটিতেই অনেক ভোটার ভোট দিতে না পারার এমন অভিযোগ করেছেন। অন্য ইউনিয়নটিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় সেখানে তেমন গোলযোগ বা ‘অনিয়ম’ হয়নি। নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এমন আটটি ইউনিয়নের কোনোটিতে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, কোনোটিতে ব্যালট ছিনতাই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ধারালো অস্ত্র নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের দায়ে এক যুবককে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

দুপুর ২টা থেকে বিকেল পৌনে ৩টা পর্যন্ত খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের চন্দ্রকোনা, তেলকুপি, ব্রাহ্মণগাঁতির তিনটি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেগুলোতে ভোটগ্রহণ শেষ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ভোটার তখনো ভোট দিতে পারেননি। চন্দ্রকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেশ কয়েকজন ভোটার জানান, সকাল ৯টার দিকে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে অন্য সব প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দিয়ে ব্যালট ছিনতাই করে। এতে নৌকার সমর্থকদের সঙ্গে জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী রাজু আহমেদের সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরে র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ঘণ্টাখানেক ভোটগ্রহণ বন্ধ রেখে পরে আবার ভোট শুরু হলেও নৌকার সমর্থকরা অন্য প্রার্থীদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রের ধারেকাছেও ভিড়তে দেয়নি।

এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনজুর রহমান বকুল বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্য হাবীবে মিল্লাত মুন্নার ঘনিষ্ঠ জেলা যুবলীগ-ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে কয়েক শ দলীয় ক্যাডার বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে নৌকায় সিল দিয়েছে। ’

দুপুর ১২টার দিকে কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বড়কয়ড়া কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। তারা ৯০০ ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়ে যায়। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কয়েকজন দুর্বৃত্ত ভোটকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ৯০০ ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় এই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

বহুলী ইউনিয়নের নির্বাচনে ধীতপুর কেন্দ্রে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ২০০ ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বলে জানান ওই কেন্দ্রে দায়িত্বরত একজন পোলিং অফিসার। পরে তারা আরো ব্যালট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে পুলিশ ছয় রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।

এদিকে ডুমুর গোলামীতে দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি চালানো হয়। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ হওয়া ছাড়াও আহত হয় বেশ কয়েকজন। এদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচজনকে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুলিবিদ্ধরা হলেন ডুমুর গোলামী গ্রামের বনি মিয়া (২৭) ও রাসেল শেখ (২৫)।

কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া ভোটকেন্দ্রে ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করায় একজনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুল আলিম (২৫) কাজিপাড়া গ্রামের আব্দুল কাদের সেখের ছেলে। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

 


মন্তব্য