kalerkantho

26th march banner

চামড়া শিল্প-কারখানা

সাভারে অনেক কারখানার অবকাঠামোই তৈরি হয়নি

তায়েফুর রহমান, সাভার   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



সাভারে অনেক কারখানার অবকাঠামোই তৈরি হয়নি

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্পের সব কারখানা সাভারে স্থানান্তর করতে সরকারের বেঁধে দেওয়া সর্বশেষ সময়সীমা ছিল গতকাল ৩১ মার্চ। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু সংসদকে জানিয়েছিলেন, এপ্রিলের মধ্যে সাভারে পুরোপুরি কাজ শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বেশির ভাগ কারখানার অবকাঠামোই গড়ে ওঠেনি এখনো। চামড়া শিল্পনগরীর জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের কাজও শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

গত বুধবার সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ কারখানায়ই নির্মাণ কাজ চলছে। হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা ভবনের তিনতলা পর্যন্ত শুধু কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। তবে শেষ হয়েছে রাস্তায় পাইপ বসানোর কাজ।

শিল্পমন্ত্রীর সর্বশেষ আল্টিমেটামের পর সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে অনেক কারখানাই অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। বিসিকের প্রকৌশলী শেলী সাদেক কালের কণ্ঠকে জানান, এ পর্যন্ত ২০ থেকে ৩০টি কারখানা রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে তাদের মেশিনপত্র স্থানান্তর করা শুরু করেছে। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কারখানার অবকাঠামোগত কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এর মধ্যে কোনোটির একতলার কাজ শেষ হয়েছে, আবার কোনোটির শেষ হয়েছে তিনতলার কাজ। চার থেকে পাঁচটি কারখানা চার থেকে পাঁচতলার কাজ শেষ করেছে। অন্তত ২০টি কারখানা চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য তাদের ড্রাম মেশিন এনে প্রস্তুত রেখেছে।

জানা যায়, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য পরিশোধনের জন্য তিনটি ভাগে বিভক্ত করে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ শুরু হয়। এই সেন্ট্রাল ইটিপিকে ইপিএস-৩, ইপিএস-২ ও ইপিএস-১ নাম দিয়ে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইপিএস-১-এর কাজ এখনো শেষ হয়নি। ইপিএস-২-এর কাজ শেষ হয়েছে এবং ইপিএস-৩-এর কাজ এখনো চলছে। সিইটিপি নির্মাণ কাজ করছে চীনের লিং জি এনভায়রনমেন্ট। তারা ২০১৪ সালের মার্চে কাজ শুরু করে।

প্রকল্প পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম কালের কণ্ঠকে বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর ১০৯ জন মালিক দু-এক দিন আগে তাঁদের নিজ নিজ কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৮৫টি কারখানা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পেয়ে যাবে এবং ২৪টি কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরো বলেন, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের একটি অংশ চালু করতেই ৫৫০ ঘনমিটার বর্জ্যের প্রয়োজন পড়বে। এ পরিমাণ বর্জ্য পেতে অনেকগুলো কারখানা চালু করতে হবে।

কয়েকজন শিল্প মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে এখনো অনেক সমস্যার সমাধান করা হয়নি। এ শিল্পনগরীতে প্রবেশের রাস্তাটাও অপ্রশস্ত। সীমানা প্রচীর অত্যন্ত নিচু এবং অনেক পকেট গেট রয়েছে। ফলে নিরাপত্তার সমস্যাও রয়েছে। এখানে মালপত্র এখনই নিয়ে এলে চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পোঁতা পিলার বা খাম্বাগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের। গত মৌসুমে ঝড়ে অনেক পিলার ভেঙে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সাভারের এই এলাকায় কাজ করতে অনেকের ১২০ ফুট পর্যন্ত পাইলিং করার প্রয়োজন পড়েছে। এতে সময় ও খরচ দুটিই বেশি লেগেছে। তারা আরো বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর একদিকে ধলেশ্বরী নদী। নদীটির তীরে বেড়ি বাঁধ নির্মাণ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। সিইটিপি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না করে কারখানাগুলো হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করলে সাভার হবে আরেকটি হাজারীবাগ। এই শিল্পনগরীর রাস্তায় গ্যাস সরবরাহ লাইন আছে। তাঁরা হাজারীবাগের কারখানায় গ্যাস সংযোগ নিতে নির্ধারিত টাকা ব্যয় করেছেন। এখন সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে পুনরায় গ্যাস সংযোগ নিতে তাদের আবার অনেক ব্যয় বাড়বে। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা হাজারীবাগের গ্যাস সংযোগের অনুমতিটাই সাভারে বলবত রাখার দাবি জানান।

শিল্প মালিকরা জানান, ট্যানারি শিল্প এলাকার বংশী নদীর পাশ দিয়ে সীমানাপ্রাচীর দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা শেষ করা হয়নি। বিভিন্ন কারখানায় পানির চাহিদা পূরণ করার জন্য তৈরি পানির পাম্পের যন্ত্রাংশগুলোও অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া বেশির ভাগ মালিক তাঁদের প্লটের সীমানাপ্রাচীর তৈরি কমর রেখেছেন। ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেননি অনেকেই।

কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেসব কারখানা এরই মধ্যে ড্রামসহ বিভিন্ন মেশিন বসিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রিলায়েন্স, মার্সোন, ঢাকা হাইডস, মক্কা-মদিনা, প্রিন্স, আজমেরী, অ্যাপেক্স।

অ্যাপেক্স ট্যানারির জেনারেল ম্যানেজার (প্রকৌশল) মোহাম্মদ আলী জানান, তাঁরা ৩২টি নতুন ড্রাম বসাবেন। এরই মধ্যে ১০টি বসানো হয়ে গেছে। এ ছাড়া রিট্যানিং ড্রাম ও ফ্লাশিং মেশিনও এনেছেন। এখন অপেক্ষা করছেন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য। তবে যে বিদ্যুৎ লাইনে তাঁরা এখন কাজ করছেন, তাতে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। তাঁদের কারখানা ভবন বেজমেন্টসহ পাঁচতলা নির্মাণ করা হবে। তিনতলার কাজ শেষ পর্যায়ে। তাঁরা এখনই কাজ করতে প্রস্তুত। কারখানায় কাজ করার জন্য প্রায় দেড় লাখ চামড়া এনে মজুদ রেখেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের কারখানাটি চালু করলে প্রায় ৭০০-৮০০ শ্রমিক লাগবে। এত শ্রমিক সাভারে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে না। হাজারীবাগ থেকে সব শ্রমিক সাভারে নিয়ে আসা হবে। সে জন্য তাঁরা চামড়া শিল্পনগরীর কাছেই ১০ বিঘা জমির ওপর শ্রমিকদের থাকার একটি ডরমেটরি নির্মাণ করবেন।


মন্তব্য