kalerkantho


কলকাতায় ফ্লাইওভার ধস

নিহত ২১, আটকা অনেক

নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



নিহত ২১, আটকা অনেক

গতকাল দুপুরে কলকাতার জোড়াসাঁকোর কর্মব্যস্ত গণেশস্টকিজ এলাকায় নির্মাণাধীন বিবেকানন্দ ফ্লাইওভারের একাংশ ভেঙে পড়ে। ছবি : কালের কণ্ঠ

তখন দুপুর সাড়ে ১২টা। কর্মব্যস্ত কলকাতার জোড়াসাঁকোর গণেশস্টকিজ এলাকা। হঠাৎ বিকট শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্মাণাধীন বিবেকানন্দ ফ্লাইওভারের একাংশ ভেঙে পড়ল নিচে থাকা মানুষ, যানবাহন ও দোকানপাটের ওপর। মুহূর্তেই চিৎকার, আহাজারি, আর্তনাদ আর গোঙানির শব্দে তৈরি হলো এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের। সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া ৮৭ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের অনেকের অবস্থাই সংকটাপন্ন। এখনো দেড় শতাধিক মানুষ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা) দিকে এ দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ মানুষ খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে। এরপর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল ডিজাস্টার ফাইটার (এনডিআরএফ) সদস্যরা উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার পরপরই কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া কোনো একটি গাড়িতে আগুনও ধরে যায়। দুর্ঘটনার আড়াই ঘণ্টা পর উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।  

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হঠাৎ করেই বোমা ফাটার মতো একটা শব্দ হয়। সঙ্গে সঙ্গেই হুড়মুড় করে ফ্লাইওভারের একাংশ ভেঙে পড়ে চার রাস্তার মোড়ের জনবহুল এলাকায়। সে সময় ওই পথ দিয়ে কেউ হেঁটে, কেউ মিনিবাসে, কেউ হলুদ রঙের ট্যাক্সিতে, কেউ বা অটোরিকশায় করে যাচ্ছিল। মিনিবাসগুলোতেই বেশি যাত্রী ছিল; তারা সব ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে। কংক্রিটের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ড্রিল মেশিন দিয়ে পাথরের স্ল্যাব কাটা হচ্ছে। ক্রেন দিয়ে সরানো হচ্ছে স্লাব।  

দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছান কলকাতার মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কর্মকর্তা রায়চন্দ মেহতা বলেন, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। ধ্বংসস্তূপে কতজন আটকা পড়েছে, এ ব্যাপারে এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

ঘটনার পর ওই এলাকায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর ছুটে আসা মানুষের ভিড়ে পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিবেকানন্দ ও চিত্পুর রোডসহ কলকাতার একাধিক সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

শশীকান্ত নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ঘটনার সময় পরিবারের লোকজনকে নিয়ে একেবারে দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলাম। এত বড় দুর্ঘটনার পর কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ’

ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর মেদিনীপুরের নির্বাচনী সভা বাতিল করে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিহতদের পরিবারের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ও আহতদের জন্য দুই লাখ টাকা করে অনুদান ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। ব্রাসেলস সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করে নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানান ও সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।

উত্তর কলকাতা থেকে হাওড়ার সঙ্গে সংযোগকারী বিবেকানন্দ ফ্লাইওভারটি তৈরির কাজ শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু কাজ এখনো শেষ হয়নি। গণেশস্টকিজ এলাকায় ফ্লাইওভারটির যে অংশ ধসে পড়েছে, বুধবার রাতে সেখানে ঢালাইয়ের কাজ করা হয়েছিল। ঘিঞ্জি এলাকায় গায়ে গায়ে ভবনের ফাঁকে অনেক সরু গলি ওই এলাকায় মূল সড়কের সঙ্গে মিশেছে। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের দোকান।

স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত ফ্লাইওভারটির নকশায় ভুল ছিল বলেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল। বড়সড় ত্রুটি ছিল এর গার্ডার স্ল্যাব নির্মাণে। যতটা ভারী থাকা উচিত সেই স্ল্যাবগুলো, তার চেয়ে সেগুলো অনেক অনেক বেশি ভারী ছিল। তাই সেগুলো ভেঙে পড়েছে। এ দুর্ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারবে না।

তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ দায় ঠেলে দিচ্ছেন পূর্ববর্তী বাম সরকারের দিকে। তিনি বলেছেন, ২০০৯ সালে বাম সরকার হায়দরাবাদের আইবিআরসিএল সংস্থাকে এ ফ্লাইওভারের কাজ দেয়। ক্ষমতায় আসার পর ওই সংস্থার কাছে ফ্লাইওভারের প্ল্যান, প্রোগ্রাম চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংস্থাটি তা দেয়নি।


মন্তব্য