kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হাজারীবাগের ট্যানারি আজ থেকে বন্ধ!

♦ শিল্পবর্জ্য না পেয়ে নদীর পানিতে চালু রাখতে হচ্ছে সাভারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট
♦ আরো কালো হচ্ছে বুড়িগঙ্গা-তুরাগের পানি

তৌফিক মারুফ   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



হাজারীবাগের ট্যানারি আজ থেকে বন্ধ!

সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে এখনো অসমাপ্ত অবস্থায় অনেক কারখানা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বুড়িগঙ্গা-তুরাগের কালো পানি দিনে দিনে আরো কালো হয়ে উঠছে। উৎকট গন্ধ হয়ে উঠেছে আরো দুর্বিষহ।

সেই সঙ্গে দেশের একসময়ের ঐতিহ্যবাহী বুড়িগঙ্গা নদী এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান দূষিত নদীর তালিকায় উঠে কলঙ্কিত করছে দেশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত সব অর্জনকে। এর সব কিছুর জন্যই বছরের পর বছর দায়ী করা হচ্ছে ঢাকার হাজারীবাগের চামড়াশিল্পকে। আদালত, সরকার, প্রশাসন—সবার নির্দেশনা-উদ্যোগকে বারবারই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা।

এদিকে সরকার প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাভারে নতুন চামড়া শিল্প নগরী স্থাপন করে বসে আছে আরো আগে থেকেই। বরং ওই নগরীর ব্যয়বহুল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট চালু রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছে শিল্পবর্জ্যের অভাবে। নিরুপায় কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট সচল রাখতে ধলেশ্বরী নদীর পানি তুলে তা ব্যবহার করছে। এ ছাড়া ব্যবহার না করায় প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ওই শিল্পনগরীর পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল ৩১ মার্চ শেষ হয়েছে ঢাকা মহানগরীর বিষাক্ত এলাকা বলে বহুল আলোচিত হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করে সাভারের নবনির্মিত চামড়া শিল্প নগরীতে নিয়ে যাওয়ার শেষ দিন। এর আগে বহুবার সময় দিয়ে তা রক্ষা করা যায়নি ট্যানারি মালিকদের নানা অজুহাতে। সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি নদী সুরক্ষাবিষয়ক আন্তমন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক থেকে চূড়ান্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয় ৩১ মার্চ পর্যন্ত। একই সঙ্গে ওই বৈঠকে হাজারীবাগ থেকে যেসব ট্যানারি কারখানা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাভারে স্থানান্তর করবে না, সেগুলোও প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জানতে চাইলে নদী দূষণ-দখল রোধ ও সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ টাস্কফোর্সের সভাপতি ও নৌপরিবহনমন্ত্রী মো. শাহজাহান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, আর কোনো সময় দেওয়া হবে না। কোনো অবস্থাতেই ৩১ মার্চের পর কোনো কাঁচা চামড়া হাজারীবাগে ঢুকতে দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্যানারি স্থানান্তর করা না হলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘ট্যানারি মালিকদের বহু সময় দেওয়া হয়েছে, তার পরও এখনো আমরা তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাঁদের ক্ষতির দিকটিও আমরা দেখছি। ’

অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও দুই দফা চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে। গতকালের (৩১ মার্চ) পর কেউ হাজারীবাগের ট্যানারিতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ওই সূত্র জানায়, হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তরে ১৪২টি প্রতিষ্ঠানকে লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেকে জবাব দিয়েছে, আবার কেউ কেউ সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। তবে ২৮টি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই সাভারের শিল্পনগরীতে ট্যানিং ড্রাম স্থাপন করেছে। ৩৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পানির লাইনের জন্য আবেদন করেছে, ৫৩টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে গ্যাসলাইনের জন্য। এ ছাড়া ১৩৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কাছে আবেদন করেছে। এর মধ্যে ৮৫টি ইতিমধ্যেই ডিমান্ড নোট পেয়েছে। বাকিগুলোর ডিমান্ড নোট প্রক্রিয়াধীন।

এদিকে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের ফলে মালিকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ইতিমধ্যেই সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গত ২০ মার্চ পর্যন্ত মোট ৫৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা মোট ক্ষতিপূরণের ২৩ শতাংশ। আর সাভার ট্যানারিতে বরাদ্দপ্রাপ্ত ১২৫টি প্রতিষ্ঠানকে এ অর্থ দেওয়া হয়েছে।

সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে ইতিমধ্যে মোট বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫৫টি ইউনিটের ভেতর ১৫৪টি প্রতিষ্ঠান তাদের স্থাপনার নকশা দাখিল করেছিল। এর মধ্যে সব কটিরই নকশা অনুমোদন করা হয়েছে। বাকি একটি মামলার কারণে বরাদ্দ জারি হয়নি। বরাদ্দ পাওয়া শিল্প ইউনিটগুলোর মধ্যে ৪২টি স্থাপনার কাজ শুরু হয়ে প্রথম তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে, দ্বিতীয় তলার ছাদ ঢালাই হয়েছে ১১টি ভবনের; তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাই হয়েছে একটি করে ভবনের। পাশাপাশি ৩৮টি ইউনিটের ভবন নির্মাণের পাইলিং শেষ করে গ্রেট বিম ও কলাম ঢালাই হয়েছে। আরো ২৬টির গ্রেট বিম ও কলামের কাজ চলছে।

গত ২০ মার্চ হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরবিষয়ক এক সভায় এ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে জানানো হয়, জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ, ফায়ার ব্রিগেড শেড নির্মাণ, পাম্প ড্রাইভার্স কোয়ার্টার নির্মাণ, সড়ক, কালভার্ট, ড্রেন, পানি সরবরাহ লাইন, সীমানাপ্রাচীর, বিদ্যুৎ লাইন, দুটি উপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, গ্যাসলাইন স্থাপন, ১৫৪টি শিল্প ইউনিটের বিপরীতে ২০৪টি প্লট বরাদ্দ ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিটগুলোর বড় ধরনের কাজগুলোর শতভাগ শেষ হয়েছে এবং বাকি কিছু কাজ এগিয়ে চলছে। এমনকি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিশেষ ইউনিটের কাজও ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চাই সরকার এবার যেন আর সময় না দেয়, বরং এবার সরকার যদি আজকের (৩১ মার্চ) মধ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনড় থাকে, তবে সরকারই সফল হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে আজকের (গতকালের) পর কোনো কাঁচা চামড়া হাজারীবাগে আর ঢুকতে না দেওয়া। তবেই ধীরে ধীরে হাজারীবাগের বিষাক্ত পরিবেশ যেমন পাল্টাতে শুরু করবে, তেমনি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বুড়িগঙ্গা, তুরাগসহ আশপাশের অন্য নদ-নদীর পরিবেশে। কারণ এখন হাজারীবাগের ট্যানারিসহ অন্য শিল্পবর্জ্যের কারণে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের পানি আরো কালো ও বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। ’

পরিবেশবাদী সংগঠনটির ওই নেতা বলেন, সাভারের ট্যানারি শিল্প নগরীটি এখন প্রায় প্রস্তুত। আশা করা যায় হাজারীবাগ থেকে যাওয়া শিল্প ইউনিটগুলো চালু হলে এটি আরো দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে সাভারের যে এলাকায় নতুন ট্যানারি চালু হচ্ছে ওই এলাকার পরিবেশের দিকেও খেয়াল রাখা।


মন্তব্য