kalerkantho


মিয়ানমারে বেসামরিক শাসন শুরু

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মিয়ানমারে বেসামরিক শাসন শুরু

নতুন এক অধ্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পা দিল মিয়ানমার। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন অং সান সু চির ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধু তিন কিয়াও। সু চির ছায়া হিসেবেই আগামীকাল শুক্রবার থেকে দেশ শাসন শুরু করবেন তিনি। সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতা তিন কিয়াও মিয়ানমারের শীর্ষ পদে থেইন সেইনের স্থলাভিষিক্ত হলেন। শপথ নেওয়ার পর যৌথ পার্লামেন্টে দেওয়া এক ভাষণে তিন কিয়াও দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য ধৈর্য ধরতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

প্রথম ভাষণেই সংবিধান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে নয়া প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সংবিধান রচনার জন্য কাজ করে যাব। এই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা জনগণ লালন করে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে। আর এ কারণেই আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। ’ তিনি বলেন, নতুন সরকার জাতীয় ঐক্য এবং জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সংঘাত বন্ধে ব্যবস্থা নেবে। আমরা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করব। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াব। ’

গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পায় এনএলডি। সামরিক জান্তা আমলে তৈরি সাংবিধানিক বাধার কারণে স্বামী, সন্তান বিদেশি নাগরিক হওয়ায় প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হতে পারেননি নোবেল বিজয়ী সু চি। এ কারণে তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী তিন কিয়াওকেই প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেয় এনএলডি। গত ১৫ মার্চ পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে তিনি নির্বাচিত হন। শপথ নেওয়ার পরপরই তাঁকে অভিনন্দন জানায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ভ্যান থিও ও মিন্ট সুয়েও এদিন শপথ নিয়েছেন। তাঁরা দুজনই প্রেসিডেন্ট পদে ভোটাভুটিতে তিন কিয়াওয়ের কাছে হেরে যান। শপথ নিয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। তাঁদের অধিকাংশই এনএলডির সদস্য। এ তালিকায় সু চির নামও রয়েছে। তিনি শিক্ষা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, পররাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্টের দপ্তরসংক্রান্ত মন্ত্রণালয় চালাবেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কোনোভাবে খর্ব হচ্ছে। প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাদের হাতেই থাকছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট তাদের। এ ছাড়া পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসনও তাদের। ১৯৬২ সালে এক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারের ক্ষমতায় সেনাবাহিনী।   

পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের সদস্য আরাকান ন্যাশনাল পার্টির উ ও হ্লা বলেন, ‘নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটিই হবে সেনাবাহিনী। সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ভর করবে তারা সহনশীল, না কঠোর কোন অবস্থান নেবে তার ওপর।

নির্বাচনে জয়লাভ করার পরই সু চি ঘোষণা করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে যে চেহারাই আসুক না কেন, সব সিদ্ধান্ত হবে সু চির।

১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া তিন কিয়াওয়ের বাবা খ্যাতিমান কবি ও লেখক মিন থু উন নিজেও এনএলডির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৯০ সালে এনএলডির টিকিটে নির্বাচিত হন তিনি।

ইয়াঙ্গুন ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিকস থেকে ১৯৬৮ সালে এমবিএ ডিগ্রি নেন তিন কিয়াও। পরে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চতর ডিগ্রি নেন তিনি। ১৯৭৫ সালে মিয়ানমারের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন তিন কিয়াও। তাঁর স্ত্রী সু সু লুইন এনএলডির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তিনিও বর্তমান পার্লামেন্টের সদস্য। এই দম্পতির কোনো সন্তান নেই।

তিন কিয়াওয়ের শ্বশুর উ লুইন এনএলডির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং বিভিন্ন সময় দলের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। শ্বশুরের সঙ্গে এনএলডি অফিসে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তিন কিয়াওয়ের। ১৯৯৫ সাল থেকে দলের কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

কিয়াওকে দুই দশক ধরে কাছ থেকে দেখেছেন এনএলডির সাবেক শীর্ষ পর্যায়ের নেতা উ জ মিন। নতুন প্রেসিডেন্ট খুবই সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ বলে মন্তব্য তাঁর। ‘আমি তাঁকে কখনোই রাগতে দেখিনি। ’ মিয়ানমার টাইমসকে বলেন তিনি। ২০০৪ সালে এনএলডি ছেড়ে আসা উ জ মিন বলেন, তিন কিয়াও তাঁর বাবার মতোই একনিষ্ঠ পাঠক ও সুলেখক। ‘দালাবান’ ছদ্মনামে একাধিক গল্প ও নিবন্ধ আছে তাঁর।

মিয়ানমার টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, তিন কিয়াও ও অং সান সু চি ইয়াঙ্গুনের মেথডিস্ট ইংলিশ হাই স্কুলে পড়েছেন। স্কুলে সু চি কিয়াওয়ের এক বছর ‘সিনিয়র’ ছিলেন। ১৯৯২ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসা কিয়াওকে সু চির অন্যতম ঘনিষ্ঠ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। সু চির মায়ের নামে করা খিন চি দাতব্য সংস্থার পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছিলেন কিয়াও।

গৃহবন্দি থাকাকালে সু চির সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিলেন কিয়াও। মাঝেমধ্যে সুচির গাড়িচালক হিসেবেও তাঁকে দেখা গেছে। সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, এএফপি।


মন্তব্য