kalerkantho


পাখি

শামুকভাঙার ‘অভয়াশ্রম’

এম. সাইফুল মাবুদ, ঝিনাইদহ   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শামুকভাঙার ‘অভয়াশ্রম’

ঝিনাইদহের শৈলকুপার আশুরহাট গ্রামে শিমুলগাছে শামুকভাঙা পাখি। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত আশুরহাট গ্রামটি বিলুপ্তপ্রায় পাখির অভয়াশ্রম। গ্রামবাসীর সচেতনতা ও ভালোবাসায় শামুকভাঙা পাখি এখানে পেয়েছে নিরাপদ আশ্রয়। শুধু শামুকভাঙা নয়, আরো নানা প্রজাতির পাখি আশ্রয় নিয়েছে আশুরহাট গ্রামের গাছে গাছে।

স্থানীয়রা জানায়, তিন-চার বছর ধরে গ্রামের গোপাল বিশ্বাস, আব্দুর রাজ্জাক, বদর উদ্দিন ও আজিজুর রহমানের চারটি পুকুরপাড়ের গাছে আবাস গড়ে তুলেছে শামুকভাঙা পাখি। শিমুল, কড়ই, শিশু, মেহগনিসহ বিভিন্ন গাছের ডালে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ওরা অবস্থান নিয়ে আছে। আর এসব গাছেই বাসা বেঁধে ওরা ডিম পাড়ছে, বংশ বিস্তার করছে।

গ্রামের পাখিপ্রেমী আব্দুর রাজ্জাক, শহিদুল ইসলাম ও ডা. আকমল হোসেন জানান, শামুকভাঙা পাখি এখন আশুরহাট গ্রামের বড় আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদের কলকাকলি আর কিচিরমিচির শব্দ গ্রামের পরিবেশে

আলাদা মাত্রার আবেশ ছড়িয়ে রেখেছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে পাখির এই দৃশ্য দেখার জন্য।

এদিকে একাধিক গ্রামবাসী অভিযোগ করেন, খাবার সংগ্রহের জন্য ঝাঁক বেঁধে খালবিলে বসতে গিয়ে শামুকভাঙা পাখিগুলো প্রায়ই চোরা শিকারিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। তা ছাড়া রাতের অন্ধকারে চোরা শিকারিরা পাখির অভয়াশ্রমে হানা দিয়েও পাখি মারছে। এ অবস্থায় পাখিগুলোর এই আবাসস্থল ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। এমনকি পাখি শিকারে বাধা দিতে গিয়ে ওই সব দুর্বৃত্ত শিকারির হুমকির মুখেও পড়তে হচ্ছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল হাই এবং ঝিনাইদহের সাবেক জেলা প্রশাসক শফিকুল ইসলাম ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আশুরহাট গ্রামে শামুকভাঙা পাখির আশ্রয়স্থল পরিদর্শন করেন। ওই সময় তাঁরা সরকারিভাবে গ্রামটিকে পাখির অভয়াশ্রম ঘোষণা দিয়ে বিলুপ্ত প্রজাতির এই শামুকভাঙা পাখি রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পরে আর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

গ্রামবাসীর দাবি, তারা গভীর ভালোবাসা দিয়েই গ্রামটিকে পাখির অভয়াশ্রম বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামটিকে পাখির অভয়াশ্রম ঘোষণা করলে সত্যিকার অর্থেই শামুকভাঙা পাখির অভয়াশ্রম হয়ে উঠতে পারে আশুরহাট গ্রাম।

পাখি পর্যবেক্ষক ও পরিবেশবিদ শরীফ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শামুকভাঙা আমাদের দেশীয় পাখি। ভারতীয় উপমহাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই পাখি দেখা যায়। এদের প্রধান খাবার শামুক। খাবারের সন্ধানে এরা জলাভূমিতে বিচরণ করে। বর্তমান সময়ে এসে জলাভূমি ও আবাসস্থলের সংকটের কারণে এই পাখি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আবাসস্থলের নিরাপত্তা দিয়ে বিলুপ্তপ্রায় শামুকভাঙা পাখি রক্ষা করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিলুপ্তপ্রায় এসব পাখির অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে পারলে দেশে এই পাখির সংখ্যা আবারও বাড়বে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটা করা সম্ভব। ’

ঝিনাইদহ ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার নজরুল ইসলাম মিয়াজী বলেন, ‘আশুরহাট গ্রামের শামুকভাঙা পাখির আবাসস্থল আমি দেখে এসেছি। খুলনা বিভাগীয় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তাও এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন। ওই গ্রামের পাখি সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ’

শৈলকুপার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিদারুল আলমও আশুরহাট গ্রামে শামুকভাঙা পাখির আবাসস্থল সরেজমিনে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘ওই এলাকায় পাখির আবাসস্থলের নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পাখি শিকার বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ওই গ্রামে একজনের বাগানে সবচেয়ে বেশি পাখির আবাস। তিনি চাচ্ছেন না যে তাঁর বাগানে শামুকভাঙা পাখিগুলো আবাস গড়ে থাকুক। আমরা তাঁকে বলেছি, পাখির জন্য আপনার কোনো ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করব। ওই গ্রামে এখন আর কেউ পাখি শিকার করছে না। ’


মন্তব্য