kalerkantho


বন্ড সুবিধার কাগজ খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে ১৫ প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম

৩৪১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ধরা পড়েছে

ফারজানা লাবনী   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বন্ডেড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে কাগজ আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করায় দেশীয় কাগজশিল্প চরম অস্থিরতায় পড়েছে। আর এ অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

তাদের ঠেকাতে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে এ অভিযানে বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী ১৫টি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খতিয়ে দেখে ৩৪১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন থেকে শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছিল। তাইওয়ান, চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তারা কাগজ আমদানি করে। মূলত রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন কারখানায় এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানে এসব কাগজ ব্যবহৃত হয়। সরকার রপ্তানি  উৎসাহিত করতে কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে এসব কাগজ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। অথচ অসৎ ব্যবসাযীরা এ সুবিধার অপব্যবহার করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে।

শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স নিয়ে অনিয়মকারী ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—উত্তরা ইপিজেডের মেসার্স কোয়েস্ট এক্সেসরিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি পিভিসি রেজিন নামের বন্ড সুবিধার কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দুই কোটি ১১ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

গাজীপুরের মেসার্স গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড টপিওকা স্টার্চ মেশিনারিজ কারখানা স্থাপন না করে কাঁচামাল আমদানি ও ওয়্যারহাউসে না রেখে খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রায় চার লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। চট্টগ্রামের গোল্ডেন সন লিমিটেড বৈদ্যুতিক পাখা খোলাবাজারে বিক্রি করে আট লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। মেসার্স সানরাইজ এক্সেসরিজ কাগজ পণ্য ডুপ্লেক্স বোর্ড ও লাইনার পেপার কালোবাজারে বিক্রি করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। ডাফ প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ডুপ্লেক্স বোর্ড খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রায় ১১ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। মেসার্স লিবার্টি এক্সেসরিজ এইচডিপি এলডিপি আমদানিতে অনিয়ম করে ১২ কোটি টাকার অধিক শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। যাত্রাবাড়ীর মেসার্স ভিকি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড আমাদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে সাড়ে সাত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। মেসার্স খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড শুল্ক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ইউপি গ্রহণ ও অবৈধভাবে কাঁচামাল সরিয়ে ২৭২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মেসার্স ফেডারেল করপোরেশন লিমিটেড কাগজ পণ্য পেপার ও পেপার বোর্ড অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করে ৩৮ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। এফএল গার্মেন্টস এক্সেসরিজ লিমিটেড কাগজ পণ্য ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট কার্ড ও পিপি অবৈধভাবে সরিয়ে এবং খোলাবাজারে বিক্রি করে ৩৭ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। মিরপুরের মেসার্স চৌগাছা প্রিন্টিং লিমিটেড খোলাবাজারে কাগজ পণ্য বিক্রির মাধ্যমে সরকারের ৩৬ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। বাড্ডার মেসার্স এসএম প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড কাগজ পণ্য আর্ট কার্ড ও ডুপ্লেক্স বোর্ড খোলাবাজারে বিক্রি করে সাড়ে ছয় কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। উত্তরার মেসার্স তরী প্যাকেজিং লিমিটেড কাগজ পণ্য আর্ট কার্ড, লাইনার পেপার ও পেপার রোল অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি করে পৌনে দুই কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

গতকাল বুধবার শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওই ১৫টি প্রতিষ্ঠান কাগজসহ বন্ডেড সুবিধার বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছিল। ৩০০ গ্রাম জিএসএমের কাগজ আমদানি নিষিদ্ধ হলেও তারা তা আমদানি করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ওয়্যারহাউস পরিদর্শন করে এবং দাপ্তরিক কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা এই অনিয়ম ধরেছি। আজও (বুধবার) চট্টগ্রামে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের বন্ডেড ইলেকট্রনিক ফ্যান জব্দ করেছি। ’ তিনি বলেন, ‘নয়াবাজার, বংশাল ও বকশীবাজারের কিছু প্রতিষ্ঠানে চোরাই কাগজ বিক্রি হয়। সেখানে আমরা অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেছি। ওই সব প্রতিষ্ঠান আমাদের কাগজ পণ্যের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে আমরা ট্রাকে অভিযান চালিয়ে চোরাই পণ্য আটক করেছি। সম্প্রতি সুপ্রিম কোটের নির্দেশে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড—কেপিপিএলের ২৭২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছি। প্রতিষ্ঠানটি তিন বছরে এ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। তাদের আরো ফাঁকি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ফের তদন্ত করা হবে। ২৭২ কোটি টাকা আদায়ে কেপিপিএলকে শাস্তির আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে এই ফাঁকির সঙ্গে যেসব কাস্টমস কর্মকর্তা জড়িত তাঁদের খুঁজে বের করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড—এনবিআরের সদস্য পারভেজ ইকবালের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি কাজ করছে। ’

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ গতকাল এনবিআর সম্মেলনে কক্ষে আগামী অর্থবছরের (২০১৬-১৭) প্রাক-বাজেট আলোচনাকালে বলেন, ব্যবসায়ীরা বন্ড মিস ইউজ আর চাচ্ছে না। বন্ড মিস ইউজের ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা অ্যালার্ট। এনবিআরকে ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানি করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বন্ড থাকুক, তাতে নজরদারি বাড়ান। শাস্তি দিন। ’ বন্ড মিস ইউজ শুধু প্লাস্টিক নয়, কাগজ, রডসহ বিভিন্ন খাতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা বন্ডে আমদানি সুবিধা পাচ্ছে এফবিসিসিআইকে তাদের তালিকা দিন, আমরা এ তালিকার ওপর কাজ করব। ’ ‘বন্ডে বছরে ৫৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়’—এনবিআর চেয়ারম্যানের এ তথ্য উল্লেখ করে আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, এটা বাজারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। ব্যবসায়ীরা যে মাথা উঁচু করে বীরের মতো ব্যবসা করবে সেখান থেকে তারা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। সত্যিকারের ব্যবসায়ী হিসেবে তারা গড়ে উঠতে পারছে না। থাইল্যান্ড, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বড় শিল্প ও ব্যবসায়ীদের দিকে তাকান তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু ছোট ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসায়ীদের দিকেও নজর দিতে এনবিআরের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বলেন, বন্ডের অপব্যবহার থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োজনে তারা যে পণ্য ব্যবহার করে সে পণ্য আমদানিতে শুল্ক এমনভাবে করতে হবে যাতে বন্ডের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

 


মন্তব্য