kalerkantho

25th march banner

এসপি ও পাঁচ ওসিকে ইসির ভৎর্সনা, ব্যাখ্যা দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



এসপি ও পাঁচ ওসিকে ইসির ভৎর্সনা, ব্যাখ্যা দাবি

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ভোট লুট ঠেকাতে ব্যর্থতা, মামলা নিতে দেরি করা ও মামলার আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার না করায় সাতক্ষীরার এসপি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির ও পাঁচ থানার ওসিকে ভর্ত্সনা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল বুধবার তাঁদের ঢাকায় তলব করে ভোটের আগের রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে কেন্দ্র দখল করে কিভাবে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটল এর ব্যাখ্যা চায় ইসি।

পাঁচ ওসি হলেন সাতক্ষীরা সদর থানার এমদাদুল হক শেখ, দেবহাটার মোস্তাফিজুর রহমান, শ্যামনগরের মো. এনামুল হক, কলারোয়ার শেখ মাসুদ করিম ও পাটকেলঘাটার তরিকুল ইসলাম।

সকাল ১১টা থেকে দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত ইসি সচিবালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে এসপি ও পাঁচ ওসির পৃথক শুনানি হয়। শুনানিতে একে একে পাঁচ ওসির বক্তব্য জানার পর এসপির বক্তব্য নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুনানির সময় ইসির ব্যাপক ক্ষোভের মুখে পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

সূত্র জানায়, যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় শুনানিতে এসপির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তিনি এসপিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ভোট লুটের আসামিরা যাতে পার না পায়, সে ধরনের অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিতে হবে। দায়সারা অভিযোগপত্র দিলে ওসিরা বিপদে পড়বেন, আপনিও বিপদে পড়বেন। আপনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব। ’ ইসি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার ও অভিযোগপত্র দিতে তাঁদের নির্দেশ দিয়েছে।

জানা যায়, শুনানিতে সিইসিসহ অন্য নির্বাচন কমিশনাররা পাঁচ ওসির কাছে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের ঘটনার ব্যাখ্যা চান। এ সময় পাঁচ ওসির চারজনই বলেন, ভোটের রাতে ব্যালটে সিল মারার খবর তাঁরা সকাল ৯টার পর শুনেছেন। এতে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে পুলিশ সদস্যদের তিরস্কার করে কমিশন। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, ‘শুধু নির্বাচনী ব্যালটে সিল মারার জন্য আপনারা মামলা নিয়েছেন। মামলায় যে ধারার কথা উল্লেখ করেছেন তা অস্পষ্ট। ভোটকেন্দ্রের দরজা ভাঙা, শোডাউন, মিছিল, পুলিশের ওপর আক্রমণসহ যত ধরনের ধারা আছে তার সব মামলায় উল্লেখ করতে হবে। দুর্বল তদন্তের জন্য আসামিরা মুক্তি পেলে আপনাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ আইনানুযায়ী আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সব আসামিকে গ্রেপ্তার ও চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

শুনানিতে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ কলারোয়ার ওসির কাছে কুশোডাংগা ইউপিতে ব্যালটে সিল মারার ঘটনায় খোরদের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই লুত্ফুর রহমান ও ডিবির ওসি এনামুলের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চান। তাঁদের স্থগিত দুই কেন্দ্রের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি স্থগিত দুই কেন্দ্রের দুই হাজার ৯০০ ভোটের মধ্যে দুই হাজার ভোট কেটে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং মামলার প্রধান আসামি আসলাম ওসির ছত্রচ্ছায়ায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ওসি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।

সূত্র জানায়, শ্যামনগর ও সদর থানার ওসিকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য সম্ভাব্য পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইসির পক্ষে বলা হয়, ‘যেসব অনিয়ম হয়েছে, ভোট লুট হয়েছে তা আপনাদের সামনেই হয়েছে। ’ এ জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শক্ত চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দেয় ইসি। দুপুর পৌন ২টায় এসপির বক্তব্যের শুরুতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিইসি। তিনি বলেন, ‘ভোটে আপনারা কী করেছেন? আমাদের নির্দেশনা পালন করেননি কেন? পুলিশ মোতায়েনের কোনো তথ্য পাঠাননি কেন? আপনি নাকি পদকপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, কিন্তু যে কাজ করেছেন তাতে কমিশন, সরকার ও পুরো পুলিশ বিভাগকেই হেয় করেছেন। আগামীতে এসব বিষয়ে দায়সারা প্রতিবেদন দিলে আপনার রক্ষা নেই। ’ অন্য কমিশনাররাও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এসপিকে নির্দেশ দেন। এ সময় এসপি বলেন, ‘দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেব। আপনাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করব। ’

শুনানি শেষে আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে এসপি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবিরের কাছে ঘটনা জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, আমার কোনো বক্তব্য নেই। ’

শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাতক্ষীরায় যারা অপরাধ করেছে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে, দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। তাঁরা (ছয় পুলিশ কর্মকর্তা) অঙ্গীকার করেছেন, ইসির নির্দেশ পালন করবেন। তাঁদের নির্দেশনা দিয়েছি অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনতে। তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা যা করা দরকার তা করা হবে। ইতিমধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ’

এক প্রশ্নের জবাবে এই কমিশনার বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনায় কেউ মামলা না করলে পুলিশকে বাদী হয়ে মামলা করতে হয়। কিন্তু পুলিশ এক দিন বিলম্বে মামলা করেছে। তাদের কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের আইনানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র দিতে বলা হয়েছে। ’

প্রসঙ্গত, গত ২২ মার্চ প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে সাতক্ষীরার ওই পাঁচ উপজেলার ১৪ কেন্দ্রে ভোট শুরুর আগের রাতে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালটে সিল মারে ও ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুষ্কৃতকারীরা। এ সময় প্রিসাইডিং অফিসারকে আটকে রাখে তারা। এক কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারকে মারধরও করা হয়। ১৪টির মধ্যে তিন কেন্দ্রে পুলিশ দুষ্কৃতকারীদের উদ্দেশে গুলি ছোড়ে। বাকি ১১টি কেন্দ্রে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা। এ জন্য ওই কেন্দ্রগুলোতে যেসব প্রার্থীর পক্ষে ব্যালটে সিল পড়েছে সেই প্রার্থীকে প্রধান আসামি করে মামলা হয়েছে। পরে ১৪ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। আর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য এসপি ও পাঁচ ওসিকে ইসিতে তলব করা হয়।


মন্তব্য