kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


রিজার্ভ চুরি নিয়ে বিএনপির গবেষণা

হ্যাকিং নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে ডিজিটাল ডাকাতি হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হ্যাকিং নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকে ডিজিটাল ডাকাতি হয়েছে

সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে রিজার্ভ থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের ঘটনাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ডিজিটাল ডাকাতি’ হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটি বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের যোগসাজশে এ ঘটনা ঘটেছে, যা হ্যাকিং নয়, ডিজিটাল ডাকাতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অথরাইজড পারসন বা সুইফট সিস্টেমের পাসওয়ার্ড ব্যবহারকারী কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেই রিজার্ভ চুরির রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন ডলার (৮০০ কোটি টাকা) লুণ্ঠন : একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব মন্তব্য করা হয়। দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য শ্যামা ওবায়েদ গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা লোপাটের বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন।

সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসটিনি কেলেঙ্কারির পর রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই ভয়াবহ ঘটনায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণ আস্থা হারাবে। শুধু গভর্নরের পদত্যাগে এই সমস্যার সমাধান নয়, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সরকার কোনোভাবেই এই ঘটনার দায় এড়াতে পারে না। তারা (সরকার) এখন পর্যন্ত এই ঘটনার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি। বিএনপি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল। তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে গবেষণার ভিত্তিতে কিছু জরুরি তথ্য দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতেই আমাদের এই উপস্থাপনা। ’

প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এই রিজার্ভ চুরিতে যারা লাভবান, সেই ফিলিপাইনে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, সিনেটে শুনানি হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ নীরব। এই নীরবতার কারণ কী তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। ’

ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ম্যাট বিশপ (matt bishop)স্কাইপে সরাসরি তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এটা স্পষ্ট যে কোথাও না কোথাও খারাপ লোকদের দুরভিসন্ধি জড়িত। যে ব্যক্তির সুইফট সিস্টেমটি ব্যবহারের অনুমতি আছে এবং যিনি ছাড়া অন্য কারো এই সিস্টেমে প্রবেশ করার অনুমতি নেই, এমন কেউ এতে জড়িত ছিল। ‘ম্যালওয়ার’-এর মাধ্যমে ওই অর্থলোপাটের সম্ভাবনাকেও নাকচ করে দেন কম্পিউটার বিজ্ঞানের এই অধ্যাপক।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষক শেইন শুকের (shane shook)বক্তব্য উদ্ধৃতি করে শ্যামা ওবায়েদ আরো বলেন, ‘আমরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তিনি বলেছেন, ভেতরকার মানুষ জড়িত না থাকলে এটি প্রায় অসম্ভব। যদি ভেতরকার লোকজন জড়িত না থাকে, তাহলে আক্রমণকারীদের ভেতর থেকে সহায়তা করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ করার জন্য যেকোনো ব্যক্তির ব্যাংকিং শিল্প সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। ’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বিএনপির এই নেত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকও সুইফটের নিরাপত্তাগত সহযোগিতা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রয়েছে সুইফটের সরবরাহ করা একটি নেটওয়ার্ক টার্মিনাল। এ টার্মিনালে মাত্র তিনটি কম্পিউটার ব্যবহার হয়। এই কম্পিউটারগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যবহূত অন্য সব কম্পিউটার থেকে একেবারে ভিন্ন। একটি নিরাপত্তা দেয়ালের মধ্যে এ কম্পিউটার তিনটি রাখা। এগুলো দিয়ে অন্য কোনো কাজ করা হয় না, কেবল সুইফটের সঙ্গে যোগাযোগ ও বার্তা আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহার হয়। আর এটি যিনি ব্যবহার করেন, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অথরাইজড পারসন।

শ্যামা ওবায়েদ দাবি করে বলেন, এই লুণ্ঠন বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কারো কাজ। সব প্রামাণিক সাক্ষ্য, সুইফট নেট আর্কিটেকচার ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এটা পরিষ্কার যে এই অর্থলুণ্ঠন কোনো হ্যাকিং কিংবা ম্যালওয়ারের কারণে ঘটেনি। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকে ডিজিটাল ডাকাতির ঘটনা।

ব্রিফিংয়ে অন্যদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আ স ম হান্নান শাহ, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, অধ্যাপক আবদুল মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


মন্তব্য