kalerkantho


গৃহবধূ ও দেবরপুত্রকে পিটিয়ে মাথা ন্যাড়া

মামলা তুলে নিতে হুমকি, ভয়ে এলাকা ছাড়া ভুক্তভোগীরা

পটুয়াখালী প্রতিনিধি   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মামলা তুলে নিতে হুমকি, ভয়ে এলাকা ছাড়া ভুক্তভোগীরা

গলাচিপার গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদে সালিসে গৃহবধূ ও দেবরপুত্রকে পিটিয়ে মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় এখন মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় এমপির ছোট ভাই ও মামলার প্রধান আসামি নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম স্বপনের ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না।

তাঁর ভয় আর আতঙ্কে স্থানীয়রা বলছে—‘এমন ঘটনা ঘটেনি, তারা কিছু দেখেনি। ’

অথচ গত ২৬ মার্চ পরকীয়া প্রেমের অভিযোগ এনে গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে সালিস বসিয়ে ওই  গৃহবধূ ও তাঁর দেবরপুত্রের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় কয়েক শ লোক উপস্থিত ছিল। পরে গৃহবধূর স্বামী গলাচিপা থানায় একটি মামলা করেন।

এদিকে প্রভাবশালীদের ভয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার সাক্ষীরাও ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। তবে গত রবিবার রাতে শামসুল হক ডাকুয়া নামের এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকি ছয় আসামি পলাতক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গজালিয়ার এক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে জানান, প্রথম দফার ইউপি নির্বাচনে খাদেমুল ইসলাম স্বপনের পক্ষে কাজ না করার প্রতিশোধ নিতে পরকীয়া প্রেমের অভিযোগ দিয়ে তাঁদের নির্যাতন করা হয়েছে।

স্বপন পটুয়াখালী-৩ আসনের এমপি আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইনের ছোট ভাই হওয়ায় ভয়ে এখন তাঁদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলছে না।

গতকাল সোমবার সকালে সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদে তালা মারা। ঘটনার পর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি খোলা হচ্ছে না। ভবনের সামনে স্থানীয় কয়েক দোকানির কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ‘শনিবার রাতের সালিসে আমরা কিছুই দেখিনি। ঘটনা শুনেছি মাত্র। ’ কী শুনেছেন জানতে চাইলে তাঁরা বললেন, ‘শোনা কথা বলতে নেই। ’

ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের ৫০০ থেকে ৬০০ গজ দূরে ইসদি গ্রাম। সেখানে হাবিব রাঢ়ির বাড়ি। বাড়ির দুটি ঘরে তালা দেওয়া। আশপাশে কোনো মানুষের দেখা মেলেনি। তবে হাবিব রাঢ়ির বাড়ি থেকে একটু এগোতেই দেখা পাওয়া গেল খোরশেদা ও মিনারা বেগম নামের দুই নারীর। জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ‘ওই সব আমরা কিছু জানি না। চেয়ারম্যান ভালো জানে, হ্যাগো দারে জিগান। ’

তবে ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বলেন, ‘বাবা, ক্যার দারে কী কমু। আপনে কেডা হেতো জানি না। কোন বিপদ আবার আমার কান্দে আইবে জানি না। ’ এই প্রতিবেদক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমার কথা কোনোহানে কইবেন না। আসল কতা অইছে, ইলেকশনে স্বপন চেয়ারম্যান মিজান রাঢ়িরে কইছেলে হ্যার পক্ষে কাম করতে। ২০০ পোস্টার দেছে মিজানেরে লাগাইতে। মিজান ওই পোস্টার লাগাই নাই। মিজান ইলেকশনে হ্যার সাপোর্ট করে নাই। এহন বোঝেন বিষয়ডা কী অইছে। ওই ঘটনা কেউ আমনেরে কিছু কইবে না, স্বপন চেয়ারম্যানের ডরে সবাইর মুখ বন্ধ। পারলে সবাই স্বপনের পক্ষে কতা কইবে। ’

নাম প্রকাশ না করে স্থানীয়রা আরো জানায়, স্বপন চেয়ারম্যানের লোকজন হাবিব রাঢ়িকে খুঁজছে। এমনকি দায়ের মামলার সাক্ষীদের খোঁজা হচ্ছে। ফলে ভয়ে সবাই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। হাবিব রাঢ়ির বাড়ি থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর কিংবা খালেদুল ইসলাম স্বপন চেয়ারম্যানের বাড়ির মধ্যে ব্যবধান একটি বিল। এ কারণে ওই এলাকার মানুষ জাহাঙ্গীর কিংবা স্বপন পরিবার সম্পর্কে কোনো কথা বলতে রাজি নয়।  

গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত চৌকিদার মোশারেফ বলেন, ‘নতুন চেয়ারম্যান স্বপন আর বর্তমান চেয়ারম্যান কুদ্দুস কোথায় আছে জানি না। তাদের মোবাইল বন্ধ রয়েছে। তবে বাড়ি ছেড়ে পলাতক রয়েছে মামলার সাক্ষী শাজাহান রাঢ়ি, রাজা হাওলাদার, রাজু হওলাদার, মো. সেলিম হাওলাদার, মিজান রাঢ়ি ও পরিতোষ শীল। ’

গলাচিপা থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রবিবার রাতে গলাচিপা পৌরসভার কালীবাড়ি রোড এলাকা থেকে শামসুল হক ডাকুয়া নামের মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ’


মন্তব্য