kalerkantho


দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী

জীবনযুদ্ধে জয়ী ওঁরা

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জীবনযুদ্ধে জয়ী ওঁরা

উজিরপুরের পূর্ব সাতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইয়াসমিন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বই শনাক্ত করা কিংবা বই নিয়ে ছোট শিশুদের গড়গড় করে পড়ানো তাঁর জন্য সহজ কথা নয়। কারণ জন্ম থেকেই তিনি দৃষ্টিহীন। যা কিছু করেন, সবই স্পর্শের অনুভূতি থেকে। এই স্পর্শই তাঁর চোখের আলো। এই আলোই তাঁকে সাফল্যের সিঁড়ি দেখিয়েছে। আর সেই সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে, উদাহরণ হয়েছেন বিরল ঘটনার।

আলোচিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই অদম্য মেধাবীর নাম ইয়াসমিন আক্তার। তিনি আলোহীন চোখেই প্রতিবন্ধিতার শৃঙ্খল ভেঙেছেন। মনের চোখ দিয়ে তিনি দেখেন পুরো বিশ্ব। একইভাবে বিশ্ব দেখান শিশু শিক্ষার্থীদের। বরিশালের উজিরপুরের সাতলা ইউনিয়নের সাতলা গ্রামের এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী চাকরি পেয়েছেন পূর্ব সাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

আরেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী গৌরনদীর সীমা আক্তারও সাফল্যের সিঁড়িতে পা রেখেছেন। শিক্ষকতা করছেন উপজেলার দক্ষিণ চাঁদশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিয়েও করেছেন আল আমিন নামে মাস্টার্স পাস আরেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীকে।

শুধু ইয়াসমিন কিংবা সীমা নন, বরিশাল বিভাগের আরো সাত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি পেয়েছেন। এরই মধ্যে তাঁরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। অভিভাবকরাও সন্তানকে পড়ানোর জন্য বিশ্বস্ত ও যোগ্য হিসেবে ছুটে আসছেন ওঁদের কাছে।

তবে এসব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কর্মজীবনে এসে কিছু সমস্যারও সম্মুখীন হচ্ছেন। নিজের শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন শ্রুতিলেখকের সহায়তায়। কিন্তু এখন স্কুলে পড়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে পারলেও লেখার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছেন। এ জন্য সহায়ক নিতে হচ্ছে। আর আইনে না থাকায় নিজের বেতনের বড় একটা অংশই সহায়ককে দিয়ে দিতে হচ্ছে।

অদম্য ৯ জন : বরিশাল নগরের ধান গবেষণা এলাকার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আল-আমিন ও সীমার ঘরে রয়েছে চার বছরের একটি সুস্থ সবল ছেলেসন্তান। প্রতিবন্ধী এই দম্পতি নিয়মিত খোঁজ নেন অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের। তাঁদের ভাষ্য মতে, এবার প্রাক-প্রাথমিকে বরিশাল বিভাগে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছয়জন চাকরি পেয়েছেন। তবে ২০১২ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির বিধান তৈরির পর এ পর্যন্ত বিভাগে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৯ জন চাকরি পেয়েছেন।

এঁদের মধ্যে বরিশালে সুদর্শন রায়, উজিরপুরে মিজানুর রহমান ও ইয়াসমীন আক্তার, গৌরনদীতে সীমা আক্তার, আগৈলঝাড়ায় বিউটি আক্তার, কুলসুম বেগম ও দেলোয়ার হোসেন, বাবুগঞ্জে শাহীনুর আক্তার এবং বরগুনার বেতাগীতে খায়রুল ইসলাম চাকরি করছেন।

চোখে জল, মনে বল : ‘পরিবার ও সমাজের কথা জানি না, চোখের আলো না থাকায় একটা সময়ে নিজেকে নিজের কাছেই বোঝা মনে হতো। মনের মধ্যে ছিল—যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পেলে আমিও যে কর্মক্ষম তা দেখিয়ে দেব। আজ মনের সেই কথা প্রকাশের সুযোগ পেলাম। ’ এভাবেই বলছিলেন উজিরপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইয়াসমীন আক্তার।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ইয়াসমিন নিয়োগপত্র হাতে পান। ওই মাসেই তিনি যোগদান করেন উজিরপুরের সাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলে প্রথম কার্যদিবসে তাঁর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, প্রতিবন্ধীর প্রতিবন্ধকতা জয় করে পড়াশোনা আর শেষে চাকরির সুযোগ তাঁকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষাক্ষেত্রের মতো এই শিক্ষকতার মহান পেশায় নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবেন।

শৃঙ্খল ভেঙেছেন শাহীনুর : বাবুগঞ্জের অদম্য শাহীনুর আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা প্রথম দিকে আমাকে দমিয়ে রেখেছিল। সেই শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে পেরেছি। আমি আসলে একজন দক্ষ শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। শিক্ষকের কাজ শিশুদের শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা খুঁজে বের করা। আমার বিশ্বাস, সেটা আমি এই স্বল্প সময়েই অনেকটা আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছি। ’

বিউটি বলেন, ‘আমি যদি কখনো নিজেকে প্রতিবন্ধী মনে করতাম তাহলে এখন যা করছি তা কখনো করা সম্ভব হতো না। ’

চাকরিতে তাঁরা সহায়কহীন : বেতাগীর খায়রুলের শিক্ষাজীবন শুরু বরিশালের অন্ধ স্কুল থেকে। পরবর্তী সময়ে তিনি এসএসসি, এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লেখাপড়া করে। নিজে পড়া শিখলেও শ্রুতিলেখক তাঁকে পরীক্ষায় সহযোগিতা করেছেন। তিনি বলেন, এখন কর্মজীবনে এসে সহায়কদের পেছনেই বেতনের একটা অংশ খরচ হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা পেলে ভালো হতো। যদিও সহায়কের বেতন সরকারিভাবে দেওয়ার এখনো কোনো বিধান তৈরি হয়নি।  

ঝালকাঠি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষক শাহিদা আক্তার চার বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা পেশায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ব্রেইল পদ্ধতি আমাদের কাছে দৃষ্টিশক্তির পরিপূরক। ব্রেইল পাতার ছয়টি ফোঁটা কতগুলো সংখ্যা নির্দেশ করে তা আমরা মুখস্থ করে রাখি। কিন্তু অনেক সময় বইটা পড়া বেশ সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য একটি অডিও ভার্সন দরকার। ’

ভোলার সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ বি এম খলিলুর রহমান বলেন, ‘একসময় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষকতার পেশায় নেওয়া হতো না। সরকারি আইন জারির ফলে সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষায় তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ভালোই করছেন। তবে সহায়কের বিষয়টি আইনে নেই। আগামীতে যাতে তাঁরা সহায়ক পেতে পারেন সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে। ’

 


মন্তব্য