kalerkantho


বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে পিছিয়ে জাপান

আরিফুর রহমান   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে পিছিয়ে জাপান

বড় কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে যখন তাবৎ দুনিয়ার কোথাও টাকা মেলে না, তখন উদার হাতে পাশে দাঁড়ায় জাপান। ঋণ দিতে অন্য দেশ যখন কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়, সেখানে নিঃশর্তে অনুদান নিয়ে এগিয়ে আসে দেশটি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার হওয়ার সব যোগ্যতা নিয়েও কেন তাহলে জাপান এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগে পিছিয়ে পড়ছে অন্যদের তুলনায়? বড় অবকাঠামো নির্মাণকাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না কেন দেশটি? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো যে নীতিতে চলে, জাপান তাদের থেকে আলাদা। বাংলাদেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়েও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের লেশমাত্র চেষ্টা কখনো করেনি জাপান। মন্ত্রী, আমলাদের ‘নিজের লোক’ বানানোর অপচেষ্টা করতেও দেখা যায়নি তাদের। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ নানা দেশ নানা রকম কথা বলছে, সেখানেও নীরব ভূমিকা পালন করে চলছে জাপান। এ দেশে সরকার গঠনে ওই দেশটি কলকাঠি নাড়ে না, সরকার পরিবর্তনে ইন্ধন দেয় না, সুবিধা পেতেও তদবির করে না। কোনো ধরনের অনিয়মে জড়ানো বা প্রভাব বিস্তার করার নীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার ফলেই তারা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে পেড়ে উঠছে না।

বাংলাদেশে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিল জাপান। কিন্তু ভূরাজনৈতিক কারণে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার। ফলে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে জাপানের কাজ পাওয়া হলো না।

গঙ্গা ব্যারাজে অর্থায়ন করতে কয়েক বছর থেকে সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল জাপান। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতের সম্মতি ছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে না। ফলে এ প্রকল্পের কাজ পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে জাপানের। জাপান যমুনা নদীর নিচে টানেল নির্মাণের প্রস্তাব দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া মেলেনি। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে জাপান। তবে এখন পর্যন্ত সরকার বিমানবন্দরের জন্য স্থানই নির্ধারণ করতে পারেনি। ফলে কবে নাগাদ বিমানবন্দরের স্থান চূড়ান্ত হবে কিংবা সেখানে আদৌ জাপানকে কাজ দেওয়া হবে কি না, এসব বিষয়ও এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে বহু পেছনে পড়ে থাকা চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বড় বড় সব কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে জাপানকে টপকে। অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার দৌড়ে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে দেশটি। যার সর্বশেষ উদাহরণ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজ, যেখানে বিনিয়োগ করতে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ দেখিয়ে আসছিল দেশটি। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়া হবে চীনকে। ভবিষ্যতে যদি আরেকটি বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়, সে কাজ জাপানকে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।

‘অর্থনীতির প্রাণ’ খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্বিতীয় কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতুতে ঋণ দিতে বছর তিনেক আগে চীনকে অনুরোধ জানিয়েছিল সরকার। কিন্তু সরকারের সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় পরাশক্তির দেশটি। জানা গেছে, সেতুতে বিনিয়োগ করলে লাভ কম, কমিশন বাণিজ্য আর সেতুসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবসারও তেমন সুযোগ থাকে না। তাই চীন টাকা দেয়নি। নিরুপায় হয়ে সরকারের তরফ থেকে তখন যোগাযোগ করা হয় জাপানের সঙ্গে। তাতে নিরাশ করেনি বন্ধুপ্রতিম দেশটি। দেশটির আট হাজার কোটি টাকা দিয়ে এখন চলছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সেতুর কাজ। এর আগে নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য বিশ্বের অনেক দেশের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত জাপানের অর্থায়নেই চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছিল।

শুধু সেতু আর বিমানবন্দর নয়, স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের এমন কোনো খাত নেই, যেখানে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি জাপান। যুদ্ধবিধ্বস্ত এ দেশের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, আনুষঙ্গিক পণ্য নিয়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল দেশটি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক সব খাতে টাকা দিয়েছিল শর্তহীন। দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে চলমান সবচেয়ে বড় দুটি প্রকল্পেও দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, ১৬ কোটি মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা, হারিকেন আর কুপির ব্যবহার থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্যুতের আলোয় উদ্ভাসিত করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল দেশটির। সেই সহযোগিতায় ছিল না কোনো কমিশন বাণিজ্যের চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবসার ধান্ধা; ছিল মানবিকতা, আন্তরিকতা আর এ দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।  

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যতম অকৃত্রিম বন্ধু জাপান, যখনই বড় আকারের ঋণ দরকার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রকল্পে অর্থ দরকার, তখনই আমরা জাপানের দ্বারস্থ হই। ’ শামসুল আলম আরো বলেন, জাপানই একমাত্র দেশ, যারা একটা সময় পর তাদের ঋণের বিপরীতে যে সুদ আসে, সেটিও মওকুফ করে দেয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে তারা কখনো হস্তক্ষেপও করে না। তিনি বলেন, জাপান দেখে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন। এর পাশাপাশি এখানকার বাজার কতটা উন্মুক্ত, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ কেমন। জাপানের প্রযুক্তি অন্য অনেক দেশের তুলনায় উন্নত বলেও মন্তব্য করেন শামসুল আলম। বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবেই জড়িত জাপান। বঙ্গবন্ধু সেতু, পাকশী সেতু, রূপসা সেতু, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশটির নাম। ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সঙ্গেও থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল দেশটি। কিন্তু বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতুতে থাকতে পারেনি। সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাপানের নীতিনির্ধারকরা। পদ্মা সেতুর সঙ্গে না থাকতে পারার আক্ষেপও আছে তাঁদের। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশের মানুষ এখন মেট্রো রেলের স্বপ্ন দেখে জাপানের বদান্যতায়। ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মাতারবাড়ীতে দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজও চলছে তাদের অর্থে। একক দেশ হিসেবে গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে জাপান, ৮৬১ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৬৭ হাজার কোটি টাকা। তাদের ধারেকাছেও অন্য কোনো দেশ নেই।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্পে অন্য দেশ ও সংস্থার কাছে সাহায্য চেয়েও পাওয়া যায়নি। কিন্তু সে প্রকল্পে অর্থায়ন করতে জাপানকে অনুরোধ করলে তারা কখনো মুখ ফেরায়নি। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশের কোনো প্রকল্পে অর্থায়নের আগে নানা ধরনের শর্ত জুড়ে দেয়। পরামর্শক তাদের দেশ থেকে নিতে হবে, পণ্য ও ঠিকাদার নিয়োগ হতে হবে তাদের দেশ থেকে। ঋণের সুদের হারও থাকে বেশি। পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের সুযোগ রাখা হয় না। আবার বড় বড় প্রকল্পের কাজ পেতে বাংলাদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে চীনসহ অন্য অনেক দেশ। লবিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের, যাতে কাজটি সহজে হাতিয়ে নেওয়া যায়। কাজ পেলে লবিস্টদের দেওয়া হয় বড় আকারের কমিশন। তা ছাড়া নতুন পুরনো প্রযুক্তিও ধরিয়ে দেয় তারা। ওই প্রযুক্তি নষ্ট হবে, আবার আনা হবে। সেখানেও থাকে কমিশন বাণিজ্য।

কিন্তু জাপানের বেলায় ঠিক তার বিপরীত চিত্র। দেশটির ঋণের সুদের হার বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সঙ্গে তুলনা করলে সবচেয়ে কম। সুদের হার ০.০১ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা ঋণ নিলে সেই ঋণের সুদের হার এক পয়সা। দেশটির ঋণ নিলে সেখানে থাকে না কোনো উদ্ভট শর্ত। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমেই ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের দেশ থেকে পণ্য নিতে হবে, ঠিকাদার হতে হবে তাদের দেশে—এমন কোনো শর্ত থাকে না জাপানি ঋণে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে প্রতি মাসে একটি বৈঠক হয়, যে বৈঠকের আলোচ্যসূচিই থাকে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোন দেশ থেকে ঋণ নেওয়া যায়। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইআরডির অতিরিক্ত সচিব শফিকুল আযম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ খোঁজার জন্য আমরা প্রতি মাসে যে বৈঠক করি, সেখানে আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমে থাকে জাপানের নাম। এরপরে আসে চীন, ভারতসহ অন্য দেশের নাম। কারণ জাপানের ঋণের সুদের হার অন্য সব দেশের তুলনায় কম। তা ছাড়া দেশটির সব প্রকল্পেই আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার ও যন্ত্রপাতি আনা হয়, যেটা অন্য কোনো দেশের বেলায় হয় না। ’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একক দেশ হিসেবে জাপান সবচেয়ে বেশি ঋণ দিলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব নেই। সামান্য কিছু ঋণ আর অনুদান দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীনসহ অন্য অনেক দেশ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেভাবে প্রভাব বিস্তার করে, সেখানে জাপান তার ধারেকাছেও নেই। এ দেশে তাদের কোনো লবিস্ট নেই। প্রকল্পের কাজ পেতে তাদের কোনো তদবিরও নেই। নীরবে-নিভৃতে দেশটি বাংলাদেশকে অর্থ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে জাপানের যে কোনো বড় লবিস্ট বা প্রভাবশালী ব্যক্তি নেই, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে। সেই বৈঠকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল জাপান। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, তৃতীয় টার্মিনালের কাজ জাপানকে দেওয়া যাবে না। সেই কাজ দেওয়া হবে চীনকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে জাপানের পক্ষে লবিং ছিল না, যেটা ছিল চীনের। সে জন্য কাজটি জাপানকে দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মোহাম্মদ ইউনূস কালের কণ্ঠকে বলেন, যে দেশের ঋণের সুদের হার কম, জটিল শর্ত থাকে না, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বেশি থাকে, ওই দেশ থেকেই ঋণ নেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে জাপানের ঋণের সুদের হার, ঋণ পরিশোধের সময়সীমাসহ অন্যান্য শর্ত অনেক সহজ। তবে দেখতে হবে, বাংলাদেশের অগ্রাধিকার প্রকল্পে ওই দেশ ঋণ দেয় কি না। তাহলেই ঋণ নেওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


মন্তব্য