kalerkantho


হোসেনী দালানে বোমা হামলা জেএমবির ১৩ জঙ্গির কাজ!

এস এম আজাদ   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হোসেনী দালানে বোমা হামলা জেএমবির ১৩ জঙ্গির কাজ!

দেশের শিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সমাবেশস্থল হোসেনী দালানে বোমা হামলা চালিয়েছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। সংগঠনটির সামরিক শাখার কমান্ডার শাহাদাৎ ওরফে আলবানি ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা ছিল ওই হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী। হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে ওই হামলায় জড়িত ছিল জেএমবির মোট ১৩ জঙ্গি। প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল পাঁচজন। তাদের মধ্যে হোজ্জা ও তার সহযোগী কবির হোসেন রাশেদ ওরফে আশিক কবরস্থানের পাশে থেকে ছুড়েছিল পাঁচটি বোমা। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর কাছে নিজেদের সক্রিয়তা জানান দিতেই জেএমবি ওই হামলা চালিয়েছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত ওই ঘটনায় রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে পাঁচ মাসের তদন্তে। শিগগিরই আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হবে।

গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, হোজ্জার নেতৃত্বে জেএমবির একটি দল ভিন্ন মতাদর্শী ও তাদের মতে ‘ইসলামবিরোধীদের’ ওপর হামলা করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর নজর কাড়তে চেয়েছে। একই কারণে তারা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরো কয়েকটি হামলা চালায়। হোজ্জার নেতৃত্বে জঙ্গিরা গাবতলীতে পুলিশ কর্মকর্তা ও আশুলিয়ায় পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। এ ছাড়া আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি করে আটজনকে হত্যা এবং বাড্ডায় পিডিবির চেয়ারম্যান খিজির খানকে হত্যা করে জেএমবি জঙ্গিরা। তবে একেক ঘটনায় হোজ্জার সহযোগী ছিল আলাদা আলাদা লোক।

হোসেনী দালানে বিস্ফোরণের পর সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ দাবি করেছিল, এটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কাজ। তবে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্তে ওই ঘটনায় আইএসের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। ঘটনায় জড়িত ১৩ জনের মধ্যে প্রধান পরিকল্পনাকারী হোজ্জাসহ তিনজন এরই মধ্যে ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরো ১০ জনকে, যাদের মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এদিকে বোমা হামলার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও হোসেনী দালান এলাকায় আতঙ্ক এখনো কাটেনি। নতুন নাশকতার আশঙ্কায় হোসেনী দালান ইমামবাড়া কর্তৃপক্ষ সেখানে তল্লাশি ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তবে এখন আর পুলিশের পক্ষ থেকে বাড়তি নিরাপত্তা নেই সেখানে।

এ-সংক্রান্ত মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা, ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হোসেনী দালানে জেএমবির যেসব সদস্য হামলা চালিয়েছে তাদের আমরা ধরতে সক্ষম হয়েছি। বিভিন্ন বিষয় অ্যানালিসিস করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হয়। তাই একটু দেরি হচ্ছে। তবে বলা যায়, তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই আমরা চার্জশিট দেব। ’ তিনি বলেন, ‘জেএমবির একটি গ্রুপ নিজেদের অস্তিত্ব বা শক্তি জানান দিতে হোসেনী দালানের জমায়েতকে বেছে নিয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। ’

ডিবি সূত্রে জানা যায়, চার্জশিটে ১৩ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তারা হলো শাহাদাৎ ওরফে আলবানি ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা, আব্দুল বাকি ওরফে আলাউদ্দিন ওরফে নোমান, সাঈদ ওরফে হিরন ওরফে কামাল, জাহিদ হাসান ওরফে রানা ওরফে মোসায়েব, আরমান, রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব, কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক, মাসুদ রানা, আহসান উল্লাহ মাহমুদ, আবু সাইদ সোলায়মান ওরফে সালমান, শাহজালাল, ওমর ফারুক ওরফে মানিক ও চান মিয়া।

সূত্র মতে, হোসেনী দালানে হামলার দুই দিন আগে রাজধানীর গাবতলীতে পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির সময় এএসআই ইব্রাহিমকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর পালানোর সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মাসুদ রানা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরাঙ্গীরচর থেকে পাঁচটি বিশেষ ধরনের হাতবোমা উদ্ধার করে পুলিশ। হোসেনী দালানেও একই রকম পাঁচটি বোমা ব্যবহার করা হয়। ইব্রাহিম হত্যা মামলার আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, রাজধানীতে পূজামণ্ডপ ও তাজিয়া মিছিলে নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে কয়েকটি গ্রুপ। গ্রেপ্তার হওয়ার পর কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জাহিদ হাসান ওরফে রানা ওরফে মোসায়েব গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২৮ জানুয়ারি জবানবন্দি দেন আরমান। এর আগে রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব ও কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক আদালতে স্বীকারোক্তি দেন। জবানবন্দিতে তারা জানায়, বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে এসে জেএমবির একটি দল সক্রিয় হয়ে ওঠে। মোহাম্মদপুরে বিহারি ক্যাম্পে শিয়াদের ওপর হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এ জন্য প্রথমে তারা মোহাম্মদপুরে বাসা ভাড়া নিয়েছিল। পরে হোসেনী দালানে হামলার পরিকল্পনা করে তড়িঘড়ি করে কামরাঙ্গীরচরে বাসা ভাড়া নেয়। রানা ধরা পড়ার পর জেএমবির সামরিক শাখার কমান্ডার মাহফুজ ওরফে হোজ্জা হোসেনী দালানে হামলার পরিকল্পনা করে। কবরস্থান থেকে হোজ্জাই পাঁচটি গ্রেনেড বোমা ছুড়ে মারে। ওই সময় তার সঙ্গে ছিল রাশেদ ওরফে আশিক। তাদের পরিকল্পনা ছিল হামলার দৃশ্য ভিডিও করার। কিন্তু আলোর স্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। রাশেদ জেএমবির আত্মঘাতী হামলাকারী দলের সদস্য।

গত বছরের ২৫ নভেম্বর গাবতলীতে ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় মাহফুজ ওরফে হোজ্জা। গত ১৩ জানুয়ারি রাতে হাজারীবাগে ডিবির সঙ্গে আরেক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় জেএমবির দুই ‘কমান্ডার’ হীরন ওরফে কামাল ও আবদুল্লাহ ওরফে নোমান। তিনজনই হোসেনী দালানে বোমা হামলা, গাবতলী ও আশুলিয়ায় পুলিশ সদস্য হত্যায় জড়িত ছিল।

গত বছরের ২৩ অক্টোবর মহররমের রাত পৌনে ২টার দিকে হোসেনী দালানের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে হ্যান্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সাজ্জাদ হোসেন সাঞ্জু নামের এক কিশোর ঘটনাস্থলে নিহত এবং শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু আহত হয়। পরে হাসপাতালে মারা যান জামাল উদ্দিন নামের আরেকজন। এ ঘটনায় চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। পরে মামলাটির তদন্তভার ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়।


মন্তব্য