kalerkantho


দুর্লভ প্রাণী

নিশাচর উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নিশাচর উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি

রেমা-কালেঙ্গার বনে রাতের আঁধারে খাবার খাচ্ছে উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি। ছবি : আশরাফুল আজিজ ওয়াফি

দিনের বেলায় সারা দিন ঘুরেই বনের কূল-কিনারা পাওয়া যায় না। সেখানে রাতের অভিযান একটা দুরূহ ব্যাপার। আর রাতের আঁধারে সেই অভিযানে ক্যামেরার লেন্সে দুর্লভ কোনো প্রাণীর ছবি তুলতে পারাটা স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের মাত্রাটা বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বনে এমনই এক অভিযানে তরুণ ফটোগ্রাফার ও শখের ছবিয়াল গ্রুপের অ্যাডমিন আশরাফুল আজিজ ওয়াফির ক্যামেরায় ধরা পড়েছে দুর্লভ প্রাণী উড়ন্ত কাঠবিড়ালি। ছবিটিতে দেখা যায়, প্রিয় খাবার তেঁতুল বিচি খাচ্ছে প্রিয়দর্শন প্রাণীটি।

আশরাফুল আজিজ ওয়াফি জানান, জীববৈচিত্র্যে ভরপুর রেমা-কালেঙ্গায় প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসে। সবারই আগ্রহ থাকে ব্যতিক্রমী কিছু দেখার, ক্যামেরায় ধারণ করার। অনেকের সৌভাগ্য হয়। আবার অনেকেই ফেরে সাদামাটা অভিজ্ঞতা নিয়ে। তবে ধৈর্য থাকলে রেমা-কালেঙ্গা ভ্রমণ সার্থক হতে পারে।

কাঠবিড়ালি আমাদের কাছে অতিপরিচিত হলেও উড়ন্ত কাঠবিড়ালি অনেকটা অপরিচিতই থেকে গেছে। এই প্রাণীটি চলাফেরা ও আকারে সাধারণ কাঠবিড়ালির চেয়ে একটু আলাদা। উড়ন্ত কাঠবিড়ালি বলা হলেও এরা কিন্তু পাখি বা বাদুড়ের মতো ওড়ে না। তবে বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে। প্যাটাগিয়া নামের এক ধরনের বিশেষ পর্দার সাহায্যে কিছু সময় বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এরা। এই কাঠবিড়ালির হাত ও পায়ের সঙ্গে শরীরের পাশ থেকে বের হয়ে আসা এক ধরনের চামড়া সংযুক্ত থাকে, যাদের বলা হয় প্যারাশুট। বিশ্রামের সময় এই প্যারাশুট দৃষ্টিগোচর হয় না। স্থিতিস্থাপক গুণের কারণে প্যারাশুটটি ওদের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকে। এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে যাওয়ার সময়েই তা দেখা যায়। এরা একটানা ২৯৫ ফুট পর্যন্ত উড়তে পারে।

শখের ছবিয়ালের অ্যাডমিন ও বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার ডা. সাইফুল্লা আল আমিন সুমন জানান, বাংলাদেশে মোট আট জাতের কাঠবিড়ালি রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ডোরা কাঠবিড়ালি। আর সবচেয়ে কম দেখা যায় উড়ন্ত কাঠবিড়ালি। দেশে হাতে গোনা দু-চারটি বনেই এদের অস্তিত্ব টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। রেমা-কালেঙ্গা ছাড়া লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে উড়ন্ত কাঠবিড়ালির দেখা পাওয়া যায়। খুব অল্প সংখ্যায় আছে চট্টগ্রামের চিরসবুজ বনে।

নিশাচর প্রজাতির এই স্তন্যপায়ীরা সন্ধ্যায় আশ্রয়স্থল থেকে খাবারের খোঁজে বের হয়। আবার ভোর হওয়ার আগেই ফিরে আসে। ফলে সহসা এদের দেখা মেলে না।

কাঠবিড়ালি সাধারণত গাছের ফলমূল, বাদাম, বাকল, বাকলের নিচের পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। তবে উড়ন্ত কাঠবিড়ালির পছন্দের খাবার তেঁতুলের বিচি। সব প্রজাতির কাঠবিড়ালিই জোড়ায় জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে। এরা পাতা, খড়কুটো, শৈবাল ও অন্যান্য নরম উপকরণ দিয়ে তৈরি গাছের গর্তে অথবা মগডালে অগোছালো বাসা বানায়। নিরাপদ মনে হলে একই জায়গায় ওরা বারবার বাসা করে। আর এই বাসা কেবল প্রজননের জন্য নয়, ঘুমানোর জন্যও ওরা ব্যবহার করে। মেয়ে কাঠবিড়ালি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে দুই থেকে চারটি বাচ্চা প্রসব করে। জন্মের সময় এরা অন্ধ ও লোমহীন থাকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সুভাষ চন্দ্র দেব জানান, উড়ন্ত কাঠবিড়ালিকে কেউ কেউ ‘উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি’ নামেও অভিহিত করে থাকে। তবে এই প্রাণী এখন উঠে এসেছে পৃথিবীর বিপন্ন প্রাণীদের তালিকায়। উড়ন্ত কাঠবিড়ালিকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১১ সালে বিশ্বে মহাবিপন্ন প্রাণীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটির ইংরেজি নাম রেড জায়ান্ট ফ্লাইং স্কুইরেল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে এদের দেখা মেলে। বাংলাদেশে আরো দুই প্রজাতির উড়ন্ত কাঠবিড়ালি দেখা যায়। এদের ইংরেজি নাম হজসন্স ফ্লাইং স্কুইরেল ও পার্টিকালারড ফ্লাইং স্কুইরেল। এরা চিরসবুজ বনাঞ্চলের বাসিন্দা। প্রাকৃতিক চিরসবুজ বন যেহেতু কমে যাচ্ছে তাই এদের বর্তমান অবস্থা ভালো নয়। তিন প্রজাতির উড়ন্ত কাঠবিড়ালি ছাড়াও সাত প্রজাতির সাধারণ কাঠবিড়ালি পাওয়া যায় আমাদের দেশে।

সুভাষ দেব আরো জানান, উড়ন্ত কাঠবিড়ালি এক গাছ থেকে অন্য গাছে দেড় শ থেকে দুই শ ফুট দূরত্বে লাফাতে পারে। ওড়ার সময় পেছনের লেজকে এরা লাগাম হিসেবে ব্যবহার করে। এই প্রজাতির কাঠবিড়ালিরা ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। সাধারণভাবে এদের আয়ুষ্কাল ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত। তবে বিপন্ন বন্য পরিবেশ ও খাদ্য সংকটের কারণে এদের গড় আয়ু এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

হবিগঞ্জের ফরেস্ট কনজারভেটিভ অফিসার রাশেদুল কবির জানান, বহুরঙা উড়ন্ত কাঠবিড়ালির কান তুলনামূলকভাবে বড়। কানের গোড়া বাঁকানো নয়। এদের চ্যাপ্টা লেজ স্পষ্ট ডিস্টিকিউয়াস। লেজের নিচের দিকে খাটো চুল থাকে। পায়ের তলে সহায়ক কোনো প্যাড থাকে না। এদের কর্তন দাঁত ফেকাসে হলুদ। পিলেজ মাঝারি ধরনের পুরু। দেহতল কালচে ধূসরাভ বাদামি কিংবা লালচে বাদামি ও পিঠ সাদা। পা ও লেজ কালচে বাদামি। অপ্রাপ্তবয়স্ক কাঠবিড়ালির পিঠ কালো ও দেহতল সাদা।


মন্তব্য