kalerkantho


জনসংখ্যার চেয়ে রোগী বেশি!

তৌফিক মারুফ   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জনসংখ্যার চেয়ে রোগী বেশি!

দেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৬ কোটি। অথচ সরকারের সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিন বলছে, ২০১৪ সালে দেশের সব ধরনের সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান মিলে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসা নিয়েছে ১৮ কোটি ২৬ লাখ ৬৫ হাজার ২৩১ জন রোগী। মোট জনসংখ্যার চেয়েও রোগীর সংখ্যা বেশি হয় কিভাবে?—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, দেশে রোগীর সংখ্যা কত, এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানই নেই। বিভিন্ন সূত্রে যে হিসাব পাওয়া যায় তার পুরোটাই গোঁজামিলে ভরা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই রোগীকে বারবার গণনা করা হচ্ছে। একই রোগী চিকিৎসার প্রয়োজনে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গেলে সেখানেও তাকে আরেকবার নতুন রোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এভাবে স্বাস্থ্যসেবা খাতের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত যেমন ফুলেফেঁপে ওঠে, তেমনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায়ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এমনকি দাতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবেও অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় অতিরিক্ত রোগীর পরিসংখ্যান। দেশের চিকিৎসা খাতে রোগীদের জন্য কেন্দ্রীয় কোনো তথ্যভাণ্ডার না থাকায় এ বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে।

আবার একই রোগী এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গেলে একই রোগের কারণে তাকে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। এতে বাড়তি খরচের বোঝা চাপছে রোগীর ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের হিসাবে দেশে রোগীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি দেখা যায়। স্বাভাবিক কারণেই একই রোগী একাধিকবার একই প্রতিষ্ঠানে বা ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাকে পাঁচ-ছয়বার বা তার চেয়েও বেশি সংখ্যায় গণনার কোনো মানে হয় না। এর চেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা আর কিছুই হতে পারে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ইমার্জেন্সি মেডিসিনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এইচ কে চৌধুরী বলেন, কার্যকর ও সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটা করতে পারলে বিশেষ করে দুর্নীতি ও অনিয়মের অনেক পথ বন্ধ হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বহুলাংশে কমবে। একই রোগীকে অপ্রয়োজনে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখেও পড়তে হবে না। সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে, চিকিৎসায় ভুলত্রুটিও কমবে।

ডা. এইচ কে চৌধুরী আরো বলেন, ভুল বা বিশৃঙ্খল তথ্য-উপাত্ত নির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কেবল অনিয়ম-দুর্নীতিরই সুযোগ সৃষ্টি হয় না, তা রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিপদ বয়ে আনে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর সংখ্যা কিংবা তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নিয়ে রোগের ধরন ও গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়। সে ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানে ভুল থাকলে তার প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পরতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণাভিত্তিক তথ্যের বরাত দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, কেবল সুষ্ঠু, কার্যকর ও সমন্বিত তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে একটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের জটিলতার ৩৭ শতাংশ কমিয়ে ফেলা সম্ভব। একই পদ্ধতিতে রোগীর মৃত্যুর হারও ৪৭ শতাংশ কমানো যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘আমি একটি কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, বান্দরবানের রামুর স্থানীয় এক বাসিন্দা অসুস্থ হওয়ার পর প্রথমে যায় স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকে। সেখানে তার নাম রেজিস্ট্রেশন করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি (কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার)। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় রেফারেল সিস্টেমে ওই রোগীকে পাঠানো হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে নতুন করে তার নাম রেজিস্ট্রেশন হয়। তার শরীরে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হয়। উপজেলা হাসপাতালে কিছু সময় রাখার পর তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে দেখা যায় তার কিডনিতে মারাত্মক সমস্যা। পরে তাকে কিডনির চিকিৎসার জন্য আরেক জায়গায় পাঠানো হয়। কিডনি থেকে নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসার জন্য আবার তাকে পাঠানো হয় নতুন হাসপাতালে। এভাবে একই রোগী পাঁচ জায়গায় নতুন রোগী হিসেবেই উপস্থাপিত হয়। এভাবে বারবার গণনায় একজন রোগী সরকারের খাতায় হয়ে যায় পাঁচজন।

সাবেক ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তার উদাহরণের প্রমাণ মেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও। ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেখানো হয়েছে, ২০১৪ সালে দেশের সব ধরনের সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান মিলে বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসা নিয়েছে ১৮ কোটি ২৬ লাখ ৬৫ হাজার ২৩১ জন রোগী। এর মধ্যে  ১৭ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭৬ জন চিকিৎসা নিয়েছে বহির্বিভাগ থেকে, ৮৫ লাখ ১৯ হাজার ৫৫৫ জন চিকিৎসা নিয়েছে জরুরি বিভাগে। আর ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা নেয় ৫৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭০৭ জন রোগী। বাকি ১০ কোটি ৪৫ লাখ ৫৩ হাজার ১৮২ জন রোগী ওই বছর কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে চিকিৎসা সেবা নেয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে একটি অনলাইন সার্ভারের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব, যাতে প্রত্যেক রোগীর জন্য একটি পরিচয় কোড থাকবে। ওই কোড যেকোনো সরকারি হাসপাতালে কার্যকর হবে। এমনকি যেকোনো একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রথমবার যাওয়া একজন রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল বা চিকিৎসকদের পরামর্শ পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনে অন্য যেকোনো হাসপাতালে গিয়েও দেখা যাবে। ফলে একই রোগীকে নতুন হাসপাতালে গিয়ে নতুন করে আগের মতো সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝামেলা ও খরচের বোঝা বইতে হবে না। সেই সঙ্গে প্রতিবছর দেশের কী পরিমাণ মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে, কত মানুষের মৃত্যু ঘটছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—তার সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে। এতে সুষ্ঠুভাবে তথ্যভাণ্ডার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি  অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগও কমে যাবে।

অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিচালক (এমআইএস) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ স্বাস্থ্য খাতের তথ্যভাণ্ডার-সংক্রান্ত দুর্বলতার কথা স্বীকার করে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আধুনিক ও সমন্বিত জাতীয় একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজ চলছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যমান বিশৃঙ্খল অবস্থার অবসান ঘটবে।


মন্তব্য