kalerkantho

25th march banner

স্বাধীনতা

লাল-সবুজে চেতনার উদ্ভাস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লাল-সবুজে চেতনার উদ্ভাস

স্বাধীনতা দিবসে গতকাল রাজধানীর হাতিরঝিলে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্বাধীনতা দিবসে বিপ্লব আর তারুণ্যের রঙে রঙিন হয়ে গিয়েছিল রাজধানী। ঘরের চার দেয়াল থেকে রাজপথ, অবয়ব থেকে হৃদয়-মনন সর্বত্রই লাল-সবুজের চেতনা। স্বদেশের প্রতি মমত্ববোধ। আর সুরে সুরে স্বাধীনতার প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। একদিকে রাজধানীজুড়ে বাজছে ‘ওরা আসবে চুপি চুপি’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’, অন্যদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই আহ্বান। দেশের গান আর ঐতিহাসিক সেই ভাষণের প্রকম্পনে দেশাত্মবোধের প্রতি নতুন করে উদ্বেলিত জনতা।

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—জাতির পিতার এমন ভাষণ বাঙালিকে যেন নতুন করে উজ্জীবিত করছিল দেশপ্রেমে। টিএসসি থেকে শাহবাগ, ছবির হাট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সর্বত্রই ছিল লোকে লোকারণ্য। স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনে ঘরের চার দেয়াল থেকে রাজপথে নেমে আসে মুক্তিপিয়াসী মানুষ। জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, প্রদীপ প্রজ্বালন, নাচ, গান, আবৃত্তি, প্রদর্শনী, নাটক, কনসার্ট আলোচনা সভাসহ নানা আয়োজনে রাজধানীসহ সারা দেশে উদ্যাপিত হয়েছে মহান স্বাধীনতার ৪৫তম বার্ষিকী। ছবি আঁকা, সংগীত ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করেছে চ্যানেল আই। সকাল ১১টায় ‘রং তুলিতে মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এতে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আসাদুজ্জামান নূর, সৈয়দ হাসান ইমাম ও শিমুল মোস্তফা। দেশের গান পরিবেশন করেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, রফিকুল আলম এবং সুরের ধারার শিল্পীরা। এবারের অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয়েছে খালিদ মাহমুদ মিঠুকে।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণামূলক ছবি আঁকেন সৈয়দ শামসুল হক, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, বীরেন সোম, অলোকেশ ঘোষ, সৈয়দ লুত্ফুল হক, হামিদুজ্জামান খান, মনিরুজ্জামান, সব্যসাচি হাজরা, সৈয়দ ইকবাল, রেজাউল করিম, কেরামত মাওলা, সৈয়দ এনায়েত হোসেন, রেজাউন নবী, সোহাগ পারভেজ, শহীদ কবির, অশোক কর্মকার, ভাস্কর রাশা, আইভী জামান, রুখসানা সাঈদা পপি, রফী হক, এলহাম হক খুকু, নারগিস পারভীন সোমা, নাসির খান, দিলরুবা লতিফ, ফারজানা আহমেদ উর্মি, সৈয়দ জাহিদ ইকবাল, আবদুস সাত্তার তৌফিক, সোহাগ পারভেজ, লুত্ফুন্নাহার মুনমুন প্রমুখ।

প্রায় ৫০ জন শিশুশিল্পী এ চিত্রাঙ্কনে অংশ নেয়। এ ছাড়া চিত্রাঙ্কনে অংশ নেন কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ ও কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা।

শিল্পকলা একাডেমি : নাচ, গান, আবৃত্তি, কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ ও মূকাভিনয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদ্যাপন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিল্পকলা একাডেমির এই আয়োজন।

শিল্পকলা একাডেমির এই আয়োজনে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে ধৃতি নর্তনালয়, নন্দন কলাকেন্দ্র স্পন্দন নৃত্যগোষ্ঠী ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নৃত্যদল। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন কৃষ্টি হেফাজ, আহকামউল্লাহ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, লায়লা আফরোজ ও শিমুল মুস্তাফা। কবিতা পাঠ করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, রবিউল হুসাইন ও ড. মুহম্মদ সামাদ। এ ছাড়া জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধের নাটক ‘টার্গেট প্লাটুন’ মঞ্চায়ন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। খুলনার চুকনগর বধ্যভূমিতে অনুষ্ঠিত হয় আর্টিস্ট ক্যাম্প ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট : নাচ, গান, আবৃত্তি, পথনাটকসহ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরে শেষ হলো সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তিন দিনের স্বাধীনতা উৎসব ২০১৬।

‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ স্লোগানের এই উৎসবের সমাপনীতে গতকাল শহীদ মিনারে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে সুরসপ্তক, আওয়ামী শিল্পীগোষ্ঠী, জাগো আর্ট সেন্টার। একক সংগীত পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, সমর বড়ুয়া, শিবু রায়, আবদুল ওয়াদুদ, অর্পণা খান। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে স্বরশ্রুতি, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, চারুকণ্ঠ ও প্রজন্ম কণ্ঠ। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যাক্ষ ও ভোরের পাখি। এতে একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন মাহফুজ রিজভী, বাপ্পী আকন্দ, জি এম মোরশেদ ও মাসুম চৌধুরী। পথনাটক ‘নাট্যযোদ্ধা’ পরিবেশন করে পদাতিক নাট্য সংসদ। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক আরো নানা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে শিশু সংগঠন মৈত্রী শিশুদল ও ঋদ্ধস্বর।

একই সঙ্গে ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরে জোটের আয়োজনে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে সুরবিহার, আনন্দন ও স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দ্র। এতে একক সংগীত পরিবেশন করেন বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, আরিফ রহমান, ফেরদৌসী কাকলি ও স্বাতী সরকার। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে মুক্তধারা আবৃত্তিচর্চা কেন্দ্র, স্বনন ও উদ্ভাসন। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন লুনা শিকদার ও কাজী রাজেশ। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নাচের দল নটরাজ। পথনাটক ‘রঙ্গপীঠ’ পরিবেশন করে থিয়েটার আর্ট ইউনিট। এ ছাড়া রবীন্দ্রসরোবরের আরো নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নেয় শিশু সংগঠন সপ্তকলির আসর।

‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ স্লোগান নিয়ে গত ২৪ মার্চ একযোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরে শুরু হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের এই স্বাধীনতা উৎসব।

কচিকাঁচার মেলা : আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদ্যাপন করেছে কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় কচিকাঁচা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর-উত্তম। কচিকাঁচার খুদে বন্ধুদের সামনে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা তুলে ধরেন।

কেন্দ্রীয় মেলার পরিচালক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন মেলার সহসভাপতি কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিশাত শারমিন নিশি এবং শিশু বক্তা নুহা।

আলোচনা শেষে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। সব শেষে মেলার সুরবিতান, কথাবিতান ও নৃত্যবিতানের  ভাইবোনের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।

বাংলা একাডেমি : স্বাধীনতা দিবসে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। বিকেলে একাডেমির নজরুল মঞ্চে আলোচনায় অংশ নেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক মমতাজ লতিফ। কল্যাণী ঘোষ, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, রূপা ফরহাদ ও মনোরঞ্জন ঘোষাল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই চার শিল্পীর সমবেত দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলা একাডেমির স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নাটকটি পরিবেশন করে নাগরিক নাট্যাঙ্গন।

শিশু একাডেমি : স্বাধীনতা দিবসে গতকাল শেষ হয়েছে শিশু একাডেমি আয়োজিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৭তম জন্মদিবসের ৯ দিনব্যাপী বইমেলা। আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাজানো হয় সমাপনী অনুষ্ঠানের কার্যক্রম। এতে আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

সাংস্কৃতিক আয়োজনে নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীরা। এ ছাড়া দেশ অপেরা পরিবেশন করে বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে যাত্রাপালা ‘বাংলার মহানায়ক’।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার পঞ্চম দিনে গতকাল সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নেয় কল্পরেখা, ইউরিকো অ্যাঞ্জেলস স্কুল, খেলাঘর, বাড্ডা আলাতুন্নেসা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও নৃত্যজন। সন্ধ্যায় মহুয়ার পালা পরিবেশন করে মানিকগঞ্জের মুকুল নৃত্যকলা একাডেমি। জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন।

বিকেলে মিরপুরে জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নেয় সপ্তসুর সংগীত একাডেমি, উইথ লিভিং লিজেন্ড, কথাসুর সাংস্কৃতিক সংগঠন, চারুলতা একাডেমি, বধ্যভূমির সন্তানদল, মিরপুর সংস্কৃতি একাডেমি, ঘাসফুল শিশু-কিশোর সংগঠন ও মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরাম।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও স্বাধীনতার মাস উপলক্ষে গত ২২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী এ উৎসব। উৎসবের কার্যক্রম একই সঙ্গে চলছে মিরপুরে জল্লাদখানা বধ্যভূমিতেও। আগামীকাল শেষ হবে এ উৎসব।

ছায়ানট : সংগীত পরিবেশন ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করেছে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। সন্ধ্যায় ছায়ানট মিলনায়তনে ‘আমি ভয় করব না’ ও ‘বাংলাভূমির প্রেমে আমার’ এই দুটি সম্মেলক গান পরিবেশন করে প্রতিষ্ঠানটির ছোটদের দল এবং ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দিব’ ও ‘বাংলা মার দুর্নিবার আমরা তরুণ দল’ এই দুটি সম্মেলক গান পরিবেশন করে ছায়ানটের বড়দের দল। অনুষ্ঠানে আরো প্রদর্শিত হয় প্রয়াত তারেক মাসুদ নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ছায়ানটের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের এ আয়োজন।


মন্তব্য