kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ইসির নির্দেশ উপেক্ষা

ভোট লুট মামলার আসামিদের নিয়ে সাতক্ষীরা এসপির সভা, মিষ্টিমুখ

কাজী হাফিজ   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোট লুট মামলার আসামিদের নিয়ে সাতক্ষীরা এসপির সভা, মিষ্টিমুখ

প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট লুটে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মানছেন না সাতক্ষীরার পুলিশ কর্মকর্তারা। কমিশন যাদের গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দিয়েছে তাদের গ্রেপ্তার তো করাই হয়নি, বরং তাদের সঙ্গেই সভা করে মিষ্টি বিতরণ করেছেন পুলিশ সুপার এবং অন্য কর্মকর্তারা।

এই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট পাঁচটি থানার ওসিদের নির্বাচন কমিশনে এসে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তলব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের কোনো দিন আসতে বলা হতে পারে।

নির্বাচন কমিশন পরবর্তী ধাপের ইউপি নির্বাচন সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে সাতক্ষীরার ভোট লুটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগের রাতে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপারে সিল মারা, প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে ঢুকে তাঁকে আটকে রাখা ও মারধর করা প্রভৃতি অভিযোগে জেলার ১৪টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউপির চারটি কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে সিল মারে পুলিশের পোশাক পরা দুষ্কৃতকারীরা। একটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারকে মারধর করা হয়। ১৪টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুটিতে—তালা উপজেলার ভাগবহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে—পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য পুলিশ গুলি ছোড়ে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ ভোটের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, রাতে ভোটকেন্দ্রে জোর করে ঢুকে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটলে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের এর দায় নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকেও জবাবদিহি করতে হবে।

সিইসির নির্দেশনা অনুসারে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারদের বলা হয়েছে, ১৪টি কেন্দ্রে যে প্রার্থীদের পক্ষে ব্যালটে সিল মারা হচ্ছিল, সেই প্রার্থীদের প্রধান আসামি করে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০-এর ৭০ ও ৭৭ বিধি অনুযায়ী থানায় মামলা করতে হবে। থানার ওসিদের মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই প্রার্থীদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া যেসব কেন্দ্রে ভোট লুট প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেই ১১টি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন-১৯৯১-এর ধারা ৫(৩) ধারায় সাময়িক বরখাস্ত করার জন্য গত মঙ্গলবারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসব কথা উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম গতকাল শনিবার সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন কমিশন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট পাঁচটি থানার ওসিদের নির্বাচন কমিশনে এসে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তলব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কবে তাদের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে হাজির হতে হবে তা আগামীকাল নির্ধারণ করা হতে পারে। কমিশন সচিবালয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের একটি তারিখ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সাতক্ষীরায় যেসব প্রার্থীর পক্ষে রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছে তারা আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। কলারোয়ার কুশডাঙ্গা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার প্রার্থী আসলামুল হক আসলামের পক্ষে ও কেরালকাতায় নৌকা মার্কার প্রার্থী স ম মোর্শেদ আলীর পক্ষে সিল মারা হয়। তালার কুমিরা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আজিজুর রহমানের পক্ষে সিল মারা হয়। শ্যামনগরের কৈখালী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিমের পক্ষে সিল মারা হয়। দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুর রহমানের পক্ষে সিল মারা হয়। সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহিয়ুর রহমানের পক্ষে সিল মারা হয়। শুধু চেয়ারম্যান প্রার্থী নয়, সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ও সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্যদের পক্ষেও সিল মারা হয়।

সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা এরই মধ্যে মামলা করেছেন। কলারোয়া থানায় এ বিষয়ে তিনটি মামলা হয়েছে। কিন্তু আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ওই সব ভোটকেন্দ্রে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদেরও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়নি।

এদিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ভোট লুটের মামলার আসামি ও অন্যদের সঙ্গে সভা সম্পর্কে বলা হয়, ২৫ মার্চ সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ লাইনে বিকেল ৩টায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬-এ অংশগ্রহণকারী জেলার সব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা করা হয়। সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) মো. আমীর খসরুর সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির পিপিএম (বার)। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মোদাছছের হোসেন, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মীর মনির হোসেন, সহকারী পুলিশ সুপার (সাতক্ষীরা সার্কেল) মো. আতিকুল হক ও সব থানার অফিসাররা (ইনচার্জ) উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সুপার বিজয়ী ও বিজিত প্রার্থীদের শুভেচ্ছা জানান। বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনে সমাধানের জন্য দিকনির্দেশনা দেন। সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। সভা শেষে উপস্থিত সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হয়।

ইসির নির্দেশনা বিষয়ে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইসি যেসব প্রিসাইডিং অফিসারকে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে তাদেরই জিজ্ঞেস করুন, মামলা হয়েছে কি না। আমার জানামতে, কোনো মামলার আসামিদের সঙ্গে আমরা সভা করিনি। ’

ইসির নির্দেশনা অনুসারে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সে নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। ’

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ইসির নির্দেশ অনুুসারে সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা কয়েক দিন আগেই মামলা করেছেন এবং ইসিকে জানিয়েছেন। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশের প্রতি ইসির স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।


মন্তব্য