kalerkantho

25th march banner

আদালতে খালুর স্বীকারোক্তি

দুই শিশুকে গজারি বনে নিয়ে হত্যা করি

এস এম আজাদ   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দুই শিশুকে গজারি বনে নিয়ে হত্যা করি

খালু রুবেল

রাজধানীর মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় বড় বোন হেলেনা বেগমের বাসায়ই থাকেন ঝর্ণা ও রত্না। বাসায় ঝর্ণার সঙ্গে তাঁর স্বামী রিকশাচালক রোমান ওরফে রুবেলের প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া হতো। একপর্যায়ে রুবেলকে বাসা থেকে বের করে দেন হেলেনা। এ ঘটনায় স্ত্রীর বড় বোনের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে রুবেল।

এদিকে হেলেনার দুই শিশুসন্তান ওবায়দুল্লাহ নাবীন (৮) ও নাজমুল হাসান (৫) স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়ত। রুবেল প্রায়ই নিজের রিকশায় করে তাদের মাদ্রাসায় পৌঁছে দিত। একদিন নাবীন ও নাজমুলকে চিপস কিনে দিয়ে রিকশায় তোলে সে। পার্কে বেড়ানোর কথা বলে নিয়ে যায় গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের গভীর গজারি বনে। এরপর নির্জন এলাকায় একে একে দুজনকে গলা টিপে হত্যা করে সে।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে রুবেল দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার পর গজারি বনে লাশ ফেলে আসার ঘটনার বর্ণনা দেয়। হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় এক বছর পলাতক থাকার পর গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম থেকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করে রুবেলকে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর সে দাবি করে, নিহত দুই শিশুর বাবা শামসুল হক এই জোড়া খুনে তাকে প্ররোচনা দিয়েছেন। কেননা নাবীন ছিল হেলেনার প্রথম পক্ষের সন্তান। তাই শুধু নাবিনকে সরিয়ে দিতে শামসুল তাকে টাকা দিতে চেয়েছিলেন। রুবেলের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব গত বুধবার শামসুল হককে আটক করে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো প্ররোচনা নয়, প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে রুবেল একাই দুই শিশুকে হত্যা করেছে। শিশুদের বাবাকে ফাঁসাতে সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। পুলিশের তদন্তে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর শামসুল হককে ছেড়ে দেওয়া হয়।

গত বছরের ৬ এপ্রিল গাজীপুরের গজারি বনের একটি জলাশয় থেকে ওবায়দুল্লাহ নাবীন ও নাজমুল হাসানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তাদের বাবা শামসুল হক লাশ শনাক্ত করেন। পরে তিনি বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, লাশ উদ্ধারের দুই দিন আগে মধ্য বাড্ডার এলাকার বাসা থেকে দুই শিশুকে অপহরণ করে তাদেরই খালু রুবেল। ঘটনার পর থেকে সে পলাতক।

বাড্ডা থানার ওসি এম এ জলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনার রহস্য আগেই জানা যায়। শুধু আমরা আসামিকে পাচ্ছিলাম না। শিশু দুটির মায়ের ওপর ক্ষোভ থেকে দুই শিশুকে রুবেল একাই গলা টিপে হত্যা করে। পরে গাজীপুরের ন্যাশনাল পার্কের পুকুরে লাশ ফেলে রেখে সে পালিয়ে যায়। ’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার এসআই মোশারফ হোসেন বলেন, ‘রুবেল প্রায় এক বছর পালিয়ে ছিল। ধরা পড়ার পর সে পরিকল্পিতভাবে শিশু দুটির বাবাকে ফাঁসাতে চেয়েছিল। ’

রুবেল জবানবন্দিতে বলেছে, সংসারের অভাব-অনটন ঘোচাতে ময়মনসিংহের গ্রামের বাড়ি থেকে পরিবার নিয়ে ঢাকায় আসেন হেলেনা। মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট ১০ একর এলাকায় ৭/১ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর বাসায় থেকে তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁর স্বামী শামসুলও শ্রমজীবী। পরে ওই বাসায় এসে ঠাঁই নেয় রুবেল ও তার স্ত্রী ঝর্ণা। রুবেল রিকশা চালাতে শুরু করে। তবে স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না। প্রায়ই ঝগড়া হতো। এতে খুব বিরক্ত হয়ে হেলেনা গত বছর মার্চের শেষের দিকে রুবেলকে স্ত্রীসহ বাসা থেকে বের করে দেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সে হেলেনার দুই শিশু সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গত বছরের ৪ এপ্রিল বাসার সামনে থেকে নাবীন ও নাজমুল এবং তাদের দুই মামাতো ভাই শাহিন (৮) ও নাইমকে (১০) চিপস কিনে দিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে যায় রুবেল। দুপুর ১২টার দিকে মধ্য বাড্ডা থেকে শাহিন ও নাইমকে সে বাসায় পাঠিয়ে দেয় এবং নাবীন ও নাজমুলকে রিকশায় তুলে নেয়। শিশু দুটিকে নিয়ে সে প্রথমে গুলশান শ্যুটিং ক্লাবে যায়া। পরে পার্কে বেড়ানোর কথা বলে তাদের গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে নিয়ে যায় রুবেল। সেখানে সে শিশু দুটিকে গলা টিপে হত্যা করে লাশ পাশের পুকুরে ফেলে দেয়। এদিকে লাশ উদ্ধারের পর রুবেল পালিয়ে যায়। এক বছর ধরে সে মিথ্যা পরিচয়ে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করছিল। মধ্য বাড্ডার বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, দুই সন্তানহারা মা-বাবা এখনো শোকে বিলাপ করছেন। তাঁরা রুবেলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।


মন্তব্য