kalerkantho


সংযুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে বিপাকে বড় কলেজগুলো

শরীফুল আলম সুমন   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সংযুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে বিপাকে বড় কলেজগুলো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। এই শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক আছেন প্রায় দুই হাজার। অন্যদিকে রাজধানীর তিতুমীর কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। এর বিপরীতে শিক্ষক সংখ্যা মাত্র ১৭১ জন। এর মধ্যে আবার ৩৭টি পদ শূন্য। ৭০ জন প্রভাষকের ৩৪টি পদ, ৫০ জন সহকারী অধ্যাপকের দুটি পদ, ১৮টি অধ্যাপক পদের মধ্যে একটি পদ শূন্য। তবে ৩৩ জন সহযোগী অধ্যাপকের সবাই কর্মরত রয়েছেন। এ অবস্থায় শিক্ষাদান অব্যাহত রাখতে এই কলেজে ৮৪ জন শিক্ষককে সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, বাতিল করা হচ্ছে সংযুক্তি। শুধু যে তিতুমীর কলেজের এ আবস্থা, তা নয়। ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, বাঙলা কলেজসহ বড় অনেক কলেজের একই অবস্থা।

এসব কলেজের চলমান সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে সংযুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক নির্দেশে সরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে সংযুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে রাজধানীর নামিদামি কলেজ থেকে ১৭ জন অধ্যাপকের সংযুক্তি বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া গত বুধবার আরো ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপকের সংযুক্তি বাতিল করে তাঁদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, ‘এটিও আমলাদের একটা চাল।

 

এতেও শিক্ষক আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হবে। শিক্ষকরা এখন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন করছেন। কিন্তু এখন বদলি ঠেকাতে অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে ৫০ শতাংশ অধ্যাপককে তৃতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে শিক্ষকদের। ’

নাম প্রকাশ না করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৩০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী আছে রাজধানীতে এমন কলেজের সংখ্যা চার-পাঁচটি। এসব কলেজে শিক্ষকসংখ্যা খুবই কম। শুধু কিছু সংযুক্ত শিক্ষক থাকায় কোনোক্রমে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল। এখন এই সংযুক্তি বাতিল হলে কলেজগুলো অর্ধেক ক্লাসও নিতে পারবে না। সংযুক্তি পেতে তদবির, টাকা-পয়সার লেনদেনসহ নানা অনিয়ম হয়, এটা সত্য। সেটা ধরতে না পেরে একটা সিস্টেমকেই মেরে ফেলা হচ্ছে। ’

মাউশি সূত্র জানায়, সংযুক্তি নেওয়া শিক্ষকের সংখ্যা ৮৪৪ জন। এর মধ্যে ৫১ জন অধ্যাপক। এসব শিক্ষকের বেশির ভাগই রাজধানীর নামিদামি কলেজ, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কলেজে রয়েছেন। ঢাকা কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার আর শিক্ষকের পদ ২০০টি। এর মধ্যে আবার ৩৫টি পদ শূন্য। তবে সংযুক্তি নিয়ে আছেন ৬৭ জন শিক্ষক। ইডেন মহিলা কলেজে শিক্ষার্থী প্রায় ৪০ হাজার। শিক্ষকের পদ ২১৬টি। শূন্য রয়েছে ৩০টি পদ। তবে সংযুক্তি নিয়ে রয়েছেন ৭৫ জন শিক্ষক। মিরপুর বাঙলা কলেজে শিক্ষার্থী প্রায় ৩০ হাজার। শিক্ষকের পদ ১১৪টি, এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৯টি পদ। তবে সংযুক্তি নিয়ে এই কলেজে রয়েছেন ৫৬ জন শিক্ষক। এ ছাড়া সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ২৪ জন, কবি নজরুল সরকারি কলেজে ৩৬ জন, বদরুন্নেছা সরকারি কলেজে ২৫ জন ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ১৫ জন শিক্ষক সংযুক্তি নিয়ে রয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সারা দেশে ৩১৬টি সরকারি কলেজ রয়েছে। এসব কলেজে শিক্ষকের পদসংখ্যা ১৫ হাজার ২৮৯টি। এর মধ্যে অধ্যাপক পদ শূন্য রয়েছে ২০৪টি, সহযোগী অধ্যাপক পদে ১৩১টি ও সহকারী অধ্যাপক পদে ৩৩৮টি পদ। সবচেয়ে বেশি পদ শূন্য রয়েছে প্রভাষক পদে। তিন হাজার ১২৭টি পদ শূন্য রয়েছে এ পদে।

মাউশির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সব সময় কলেজে প্রায় চার হাজার পদ শূন্য থাকে। অথচ প্রতিটি বিসিএস থেকে সাত-আটশ শিক্ষক পাওয়া যায়। একই সঙ্গে প্রতিবছর আবার ওই পরিমাণ শিক্ষক অবসরেও চলে যান। এ জন্য বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে একটি বিশেষ বিসিএস দরকার হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া যদি একবার বেশিসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে সংকট দূর হবে। ’

এসব বিষয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্যসচিব এ কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, বড় কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষক নেই। সংযুক্তি শিক্ষক দিয়ে কিছুটা হলেও শিক্ষক সংকট পূরণ করা হতো। এখন যদি সংযুক্তি পুরোপুরি বাতিল করা হয় তাহলে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো বিপদে পড়বে। এখন সবচেয়ে বেশি দরকার শূন্য পদ পূরণ করা। এ ছাড়া ‘এনাম কমিটি’র সুপারিশ অনুযায়ী কলেজগুলোতে শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা দরকার। সেটা করার পর সরকার সংযুক্তি বাতিল করলে কোনো সমস্যা হবে না।

জানা যায়, গত সোমবার একযোগে ১৭ জন অধ্যাপকের সংযুক্তি বাতিল করে নতুন কর্মস্থলে তাঁদের পদায়ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব শিক্ষকের বেশির ভাগই রাজধানীর নামিদামি কলেজে সংযুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে সরকারি বাঙলা কলেজের চারজন, ইডেন মহিলা কলেজের দুজন, ঢাকা কলেজের পাঁচজন, সরকারি তিতুমীর কলেজের পাঁচজন এবং রাজশাহী সরকারি কলেজের একজন অধ্যাপকের সংযুক্তি বাতিল করে নতুন পদায়ন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বর্তমানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আরো কোন কোন শিক্ষকের সংযুক্তি বাতিল করা যায় তা নিয়ে কাজ করছে মন্ত্রণালয়। তবে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির কাছ থেকেও সংযুক্তি বাতিল না করার তদবির আসছে। শিক্ষকরা নানাভাবে তাঁদের বদলি ঠেকাতে মন্ত্রণালয় ও মাউশিতে ধরনা দিচ্ছেন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ও উভয় সংকটে পড়েছে।

এসব বিষয়ে মাউশির উপপরিচালক (সরকারি কলেজ) এ এস এম এ কে সাব্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব কলেজের কাছে তথ্য চেয়েছি। কোন কলেজে কতজন সংযুক্তি নিয়ে আছেন তা জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রতিদিনই কলেজগুলো আমাদের কাছে তথ্য পাঠাচ্ছে। আমরা আবার সেসব তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। মন্ত্রণালয়ই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমরা শুধু নির্দেশ পালন করছি। ’


মন্তব্য