kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

কলম ভাস্কর্য ও জাদুঘর

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কলম ভাস্কর্য ও জাদুঘর

নির্মিতব্য কলম ভাস্কর্যের নকশা। ছবি : কালের কণ্ঠ

২০১২ সালের মাঝামাঝির ঘটনা। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আউশনারা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ক্লাস চলছে।

হঠাৎ এক শিক্ষার্থীর কলমের কালি শেষ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে কলমটি পাশের জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে মারে সে। কিন্তু জানালার গ্রিলে লেগে সেটি ফিরে এসে পাশের বেঞ্চে বসা আরেক শিক্ষার্থী আলমগীরের চোখে আঘাত করে। কলমের নিব ঢুকে যায় চোখের রেটিনায়। চিকিৎসায়ও কাজ হয়নি। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায় চোখটির। আর সেই সঙ্গে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেয় আলমগীর।

দুঃখজনক ওই ঘটনা ব্যাপকভাবে নাড়া দেয় মধুপুরেরই কলেজ ছাত্র জাহাঙ্গীর কবিরকে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এক ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা মাথায় আসে তাঁর—কলম ভাস্কর্য নির্মাণ। জানা মতে বিশ্বে প্রথমবারের মতো নেওয়া এ উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভাস্কর্য ২১’। এর লোগোতে কলমের নিবের ওপরের অংশ বৃত্ত হয়ে এর ওপরে জ্বলছে আলোকরশ্মি। সেই আলোকে ঘিরে রেখেছে বেশ কয়েকটি কলম। যার ভেতরে রয়েছে স্লোগান—‘চল ইতিহাস গড়ি, নাম লিখি ভাস্কর্যে’।

কলম ভাস্কর্যের পাশাপাশি জাদুঘরে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের কলমও। ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হবে ৫০ লাখ কলম দিয়ে। এটির নকশা করেছে শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ। সহযোগিতা করছেন বরেণ্য ভাস্কর মৃণাল হক।

উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘কলম দিয়ে আমরা আলোকিত হই। আবার ক্ষণিকের অসতর্কতায় পরিত্যক্ত কলমের আঘাতে একটি শিশু দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। অথচ পরিত্যক্ত কলম দিয়ে অনেক কিছু বানানো যায়। প্লাস্টিকের কলম অনেক বেশি টেকসই। এ কলম দিয়ে কিছু তৈরি করলে সেটি দীর্ঘদিন থাকে। আর কলম দিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের জাগরণ সৃষ্টি হবে। ’

মধুপুর উপজেলার চুনিয়া আনন্দবাজার এলাকায় জাহাঙ্গীর কবিরের প্রতিষ্ঠিত আলোর ভুবন আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই নির্মিত হচ্ছে এ কলম ভাস্কর্য। পাশেই থাকবে কলম জাদুঘর। পরিকল্পনাটিকে বাস্তবে রূপ দিতে বেছে নেওয়া হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির সময়টাকে। কলম ভাস্কর্য নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করা হবে আগামীকাল রবিবার।

উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর কবির জানান, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির সময়কে লক্ষ্য হিসেবে রেখে ভাস্কর্য ও জাদুঘর-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে ৫০ সংখ্যাকে নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন তরুণ ও সমসংখ্যক তরুণী সম্পৃক্ত হয়েছে এ উদ্যোগের সঙ্গে। আর বাংলাদেশের ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৫০টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর ৫০ লাখ ব্যবহৃত কলম দ্বারা নির্মাণ করা হবে কলম ভাস্কর্য। এর উচ্চতাও হবে ৫০ ফুট। পাশের জাদুঘরে স্থান পাবে বারাক ওবামাসহ বিশ্বের ৫০ জন বরেণ্য ব্যক্তি এবং বাংলাদেশের ৫০ বরেণ্য ব্যক্তির ব্যবহৃত কলম।

গিনেজ বুকে নাম লেখানোর প্রত্যয় নিয়ে ১৬টি জেলা থেকে পরিত্যক্ত কলম সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২০ লাখ পরিত্যক্ত কলম সংগ্রহ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র জাবেদ জাফরি সংগ্রহ করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের ব্যবহৃত কলম। অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ঢাকা কলেজের ছাত্র জাহাঙ্গীর কবিরের আমেরিকার মিসিগান শহরের বন্ধু রবার্ট ডি ও তাঁর বড় বোন ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ব্যবহৃত কলমও।

কলম ভাস্কর্য ও কলম জাদুঘর নির্মাণের প্রচারণায় তৈরি হয়েছে একটি সংগীত। এটি লিখেছেন বিখ্যাত গীতিকার মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান এবং সুর করেছেন মাইনুল ইসলাম খান। কণ্ঠ দিয়েছেন দেশবরেণ্য শিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা ও মাকসুদ। তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছে আরো ৪৮ জন তরুণ-তরুণী।

কলম ভাস্কর্য ও কলম জাদুঘর নির্মাণের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন আউশনারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। তাঁর বিদ্যালয়ের ছাত্র আলমগীরই কলমের আঘাতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আলমগীরের চোখের চিকিৎসায় এ বিদ্যালয় থেকে ৩০ হাজার টাকা সহযোগিতা করা হয়। মধুপুরের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকেও সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্তু ছেলেটির ওই চোখ আর ভালো হয়নি। পরে সে স্কুলে আসাও বন্ধ করে দেয়। মধুপুরে কলম ভাস্কর্য নির্মাণ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ জানাই। ’

মধুপুর জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, ‘ছাত্রদের এ উদ্যোগ খুবই ভালো। ওদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভালো। ওদের আগাম অভিনন্দন জানাই।

 


মন্তব্য