kalerkantho


নাজুক সঞ্চালন লাইন গ্রিড বিপর্যয়ের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নাজুক সঞ্চালন লাইন গ্রিড বিপর্যয়ের শঙ্কা

দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টার (এনএলডিসি) অনুমোদিত ফ্রিকোয়েন্সি বা তরঙ্গ মানে না। এর ফলে যেকোনো সময় জাতীয় সঞ্চালন লাইন বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারে।

আর সে রকম কিছু হলে সারা দেশে বিদ্যুত্ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। গতকাল শুক্রবার বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এনএলডিসির পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। জাতীয় বিপর্যয় ঠেকাতে অবিলম্বে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ফ্রিকোয়েন্সি মেনে চলার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন এনএলডিসির প্রকৌশলীরা। প্রতিমন্ত্রী গতকাল এনএলডিসির কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন।

২০১৪ সালের নভেম্বরে সারা দেশে ব্ল্যাক আউটের ঘটনার পর বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গ্রিড লাইনের অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে তদন্তে। তখন দেখানো হয়, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ও সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক হয়নি।

এনএলডিসির পক্ষ থেকে প্রতিমন্ত্রীকে জানানো হয়, ২০১৪ সালে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় বা ব্ল্যাক আউটের পর থেকে এনএলডিসি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারণ করে দিয়েছে ৪৯ দশমিক ৯ থেকে ৫০ দশমিক ১ হার্টজ। এ বিপর্যয়ের আগে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর তরঙ্গ ছিল ৪৮ দশমিক ৫ থেকে ৫১ দশমিক ৫ হার্টজ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার পুরোটা বা বেশির ভাগই উৎপাদন করে না।

উদাহরণ হিসেবে এনএলডিসি বলছে, যদি কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারে তাহলে তাকে ৯০ মেগাওয়াট উৎপাদন বজায় রাখতে হবে। যদি কোনো কারণে জাতীয় সঞ্চালন লাইনের তরঙ্গ কমে যায় তাহলে (বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমলে তরঙ্গও কমে যাবে) সঙ্গে সঙ্গে এনএলডিসির নির্দেশ মেনে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। এনএলডিসি এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ ও নির্দেশনা প্রত্যাশা করছে।

২০১৪ সালের ১ নভেম্বর সারা দেশ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে পড়ে। ভারত থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা হয়ে যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশ, সেই সঞ্চালন লাইনে হঠাৎ করেই তরঙ্গ কমে যায় (ভারত থেকে আমদানির ৫০০ মেগাওয়াট কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে এ ঘটনা ঘটে)। এ থেকে বিপত্তি দেখা দিলে সারা দেশ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, কোনো দেশের সঞ্চালন লাইনে মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ কোনো কারণে হুট করে বন্ধ হয়ে গেলে সে দেশের গোটা সঞ্চালনব্যবস্থা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারে। ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর সারা দেশে তখন বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছিল পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের মতো। ফলে বড় ধরনের বিপর্যয়ে টানা প্রায় দেড় দিন সারা দেশ অন্ধকারে থাকে।

জানা গেছে, সরকার ভারত থেকে আগের ৫০০ মেগাওয়াটের সঙ্গে আরো ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। ভবিষ্যতে আরো বিদ্যুৎ সেখান থেকে আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে শিগগিরই চুক্তি সই হবে। এ ছাড়া ভারতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স লিক্যুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) তিন হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র করার চুক্তি সই করেছে সরকারের সঙ্গে। ভারতের আরেক বৃহৎ কম্পানি আদানি ভারত থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে বিক্রি করবে। পুরো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য এনএলডিসিকে ঢেলে সাজাতে হবে।

এ ছাড়া সরকার ব্যাপকভাবে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতা দিয়ে এই বিদ্যুৎ পরিবহন সম্ভব নয়। এ জন্য এনএলডিসির তরফ থেকে বিকল্প গ্রিড তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখন একটি মাত্র গ্রিড লাইনে সব বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয়। এ জন্য বিকল্প গ্রিড লাইন করার সুপারিশ করা হয় বৈঠকে।

জানা গেছে, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এনএলডিসিকে আধুনিকায়ন করতে চাইছে। এ জন্য এনএলডিসিকে পৃথক কম্পানি করারও প্রক্রিয়া চলছে। পৃথক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ থাকলে এনএলডিসির কার্যক্রম আরো সুচারু হবে বলে মনে করছে সরকার।

গতকাল এনএলডিসির সঙ্গে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের আলোচনায় জানানো হয়, ঢাকার বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার সবটুকু ভূগর্ভে নিয়ে যাওয়া উচিত। বর্তমানে খাম্বার সাহায্যে ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণে নানা সমস্যা তৈরি হয়। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ বিতরণ বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে ডেসকো ও ডিপিডিসি কিছু সরবরাহ লাইন ভূগর্ভে নিয়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে বিতরণের পুরোটাই ভূগর্ভে নিয়ে যেতে হবে।

বৈঠকে জানানো হয়, দেশে যেভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা করা হচ্ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে। বৈঠকে পাওয়ার গ্রিড কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আল বেরুনীসহ এনএলডিসির প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।


মন্তব্য