kalerkantho


ভূগর্ভস্থ পানিও নিরাপদ নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভূগর্ভস্থ পানিও নিরাপদ নয়

সত্তরের দশকের আগে দেশের মানুষের কাছে সুপেয় পানির প্রধান উৎস ছিল ভূপৃষ্ঠ বা পুকুর, নদী-খাল, বৃষ্টি আর জমিয়ে রাখা পানি। সত্তরের দশকের শুরুতে কৃষিকাজের জন্য দেশে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু হয়। আশির দশকে তা ব্যাপকতা পায়। সেই যে শুরু এরপর আর থামানো যায়নি। গত চার দশকে দেশে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১০০ শতাংশ। খাবার পানি, রান্না, গোসল, সেচ, এমনকি দৈনন্দিন কাজেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মানুষ। যদিও নিরাপদ নয় ভূগর্ভস্থ পানিও।

ঢাকা ওয়াসার এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে এখন ৮০ শতাংশ পানি ব্যবহার করা হয় ভূগর্ভস্থ থেকে, আর মাত্র ২০ শতাংশ পানি ব্যবহার হয় উপরিভাগ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর মানুষের যেভাবে নির্ভরশীলতা বাড়ছে, তাতে একসময় খাবার পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে। পানির স্তর আরো নিচে নেমে যাবে। দেয়াল ও ভবনে ভাঙন দেখা দেবে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানি আরো বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো উচিত, বিপরীতে উপরিভাগের পানি ও বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়ানো উচিত।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিবছর ভূগর্ভের পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার করে নিচে নামছে। ভূগর্ভের পানির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা না হলে আগামী পাঁচ বছর পর আরো আশঙ্কাজনক হারে পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। আর্সেনিকের পরিমাণও বাড়বে। তখন নানা ধরনের দুর্ঘটনারও আশঙ্কা করা হয়েছে ওই গবেষণায়।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূগর্ভের পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে দেশের বিভিন্ন অংশে মার্চ-এপ্রিলে ভূগর্ভের পানির স্তর সমুদ্রের পানির উচ্চতার চেয়ে তিন থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে।  

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে পানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম আশরাফ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাভাবিক নিয়মে ভূগর্ভস্থ পানির যে স্তর খালি হয়, তা পরবর্তী সময়ে প্রাকৃতিকভাবেই পূরণ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকাসহ আরো কিছু এলাকায় তা হচ্ছে না। ভূগর্ভের পানি শুধু কমছে, বাড়ছে না। আগে থেকেই অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিমাত্রায় নলকূপ বসিয়ে ইচ্ছামতো পানি তুলে ফেলায় অবস্থা এমন হয়েছে যে এখন আর পানি আমাদের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে না। ’ তিনি বলেন, সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করলেও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট দিয়ে পানির সঠিক মাত্রায় নিরাপদ করা যাচ্ছে না মারাত্মকভাবে পানিদূষণের কারণে।

অধ্যাপক আশরাফের বক্তব্যের যৌক্তিকতা মিলল বিএডিসির ওই গবেষণায়। সংস্থাটির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ষাটের দশকে ৫০ ফুট নিচ থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উঠানো যেত। কিন্তু এখন ১৫০ ফুট নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। এতেই প্রমাণিত হয়, প্রতিবছর কী হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। গবেষণায় আরো দেখানো হয়েছে, সাধারণত মাটির নিচ থেকে যে পানি উঠানো হয়, সেটি নদী, খালবিল ও মাটি

থেকে তৈরি হওয়া। পানি উঠালে প্রাকৃতিকভাবেই আবার পানি চলে আসত। কিন্তু এখন আর ভূগর্ভে সেই পানি যায় না। এর কারণ সেচব্যবস্থা। বোরো মৌসুমে প্রতিবছর যে হারে পানি সেচের জন্য ভূগর্ভ থেকে তোলা হয়, সে পরিমাণ পানি মাটির নিচে যায় না। ফলে পানির স্তর আরো নিচে নেমে যায়। এ কারণে অগভীর তো দূরের কথা, গভীর নলকূপ দিয়েও অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক আনোয়ার জাহিদ সম্প্রতি তাঁর এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, আশির দশকে দেশে অপরিকল্পিতভাবে অগভীর নলকূপ বসানো শুরু হয়। সে কারণে দেশে এখন পানির সংকট। গত তিন দশকে দেশে অগভীর নলকূপ বসানোর হার বেড়েছে প্রায় শতভাগ। ১৯৮৫ সালে সারা দেশে অগভীর নলকূপ ছিল এক লাখ ৩৩ হাজার। ২০১৩ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখেরও বেশি। অগভীর নলকূপ বসাতে কম খরচ লাগে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণও কম করতে হয়। এ জন্য অগভীর নলকূপ বসানোর প্রবণতা বেশি। প্রবন্ধে তিনি আরো দেখিয়েছেন, দেশে এখনো ১৬ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। এদের সবাই খেটে খাওয়া মানুষ।

এদিকে বিভিন্ন দূষিত পদার্থের প্রকট উপস্থিতির কারণে গভীর নলকূপের পানিও এখন আর নিরাপদ নেই। এতে ঢুকে পড়েছে পানিবাহিত রোগের উপাদান ব্যাকটেরিয়া। সেটাও ভয়াবহ মাত্রায়। এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ পরিচালিত ওয়াটার কোয়ালিটি টেস্টিং ল্যাবরেটরির এক গবেষণায় বাংলাদেশের অধিকাংশ নলকূপের পানিতে ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ম্যাঙ্গানিজ নামের একটি ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ভারী এ ধাতুটি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। গবেষকরা বলছেন, মাটির নিচে পানির স্তরে ভারী ধাতুর উপস্থিতির কারণে সেই পানি পানের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়ছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক আনোয়ার জাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের যে নিম্নগামিতা, সেখান থেকে উত্তরণে দরকার ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়ানো। বিশেষ করে ঢাকা ও বরেন্দ্র এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা পুনর্ভরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আর পানিতে যে ভারী ধাতু, আর্সেনিক ও দূষিত পদার্থ পাওয়া যায়, সেখান থেকে উত্তরণেও বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।


মন্তব্য