kalerkantho


স্বাস্থ্য সুরক্ষা

নিঃস্বরা পাবে বিনা মূল্যের চিকিৎসা

তৌফিক মারুফ, কালিহাতী (টাঙ্গাইল) থেকে ফিরে   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নিঃস্বরা পাবে বিনা মূল্যের চিকিৎসা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য কার্ড তুলে দেন দরিদ্রদের হাতে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ক্রাচে ভর দিয়ে অনেক কষ্টে কালিহাতী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনের বারান্দায় উঠে এলেন পার্শ্ববর্তী সালেঙ্গা গ্রামের ফরিদ হোসেন (৫২)। বললেন ‘প্রায় ২৫ বছর আগে বাতজ্বরে ধরছিল।

তারপর একটা পা আর এক হাতে প্যারালাইসিস হয়। চিকিৎসা করতে করতে জমিজমা, ভিটামাটি যা ছিল, সব বিনাশ হইছে। এখন নিঃস্ব হইয়া মানুষের কাছে হাত পাইত্যা যা পাই, তা দিয়াই সংসার চালাই। পয়সার অভাবে আর চিকিৎসাও ঠিকমতো করাইতে পারি না। এর মইধ্যেই স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন আমার বাড়ি গিয়া আমার নাম লেখাইয়া নিছে। আমার নামে একটা স্বাস্থ্য কার্ড অইছে। আইজকা এই অনুষ্ঠানে আমারে ওই কার্ড দেওয়া অইছে। এইডা দিয়া বাকি জীবন বিনা পয়সায় চিকিৎসা অইবো। আমার আর কোনো চিন্তা নাই। খুব খুশি অইছি। ’

ফরিদের পাশেই বসে ছিলেন ঘুণি গ্রামের কার্তিক চন্দ্র দেবনাথ ও চান মাহামুদ। তাঁদের মুখেও খুশির ঝিলিক। দুজনেই বললেন, ‘আগে কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবি নাই আমাগো দ্যাশে এ্যামন বিনা পয়সার চিকিৎসার সুযোগ অইবো। অসুখের চিকিৎসা করাইতে নিজেগো পকেটের একটা পয়সাও খরচ অইবো না; উল্টা সরকার আমাগো ট্যাকা দিবো!’

গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে) উদ্বোধন করেন। কালিহাতী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলায়ও একই কার্যক্রম শুরু হয়ে যায় এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। অনুষ্ঠানে এসএসকে তালিকাভুক্ত কার্ডধারী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ অংশ নেয়।

এ সময় সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সৈয়দ মনজরুল ইসলাম, টাঙ্গাইলের জেলা পরিষদ প্রশাসক ফজলুর রহমান ফারুক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নুরুল হক, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ওয়াহিদ হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মো. আসাদুল ইসলাম স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এ সময় তিনি জানান, আপাতত কেবল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে তা অন্যদের মধ্যেও কার্যকর করতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এ কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত কার্ডধারীরা ৫০টি রোগের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে করাতে পারবে। এ ক্ষেত্রে যেসব চিকিৎসা কেবল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে করাতে হবে সেগুলোর সম্পূর্ণ ব্যয় সরকারের বিশেষ স্কিম থেকে দেওয়া হবে। আর যাদের চিকিৎসা বহির্বিভাগে হবে তাদেরও কোনো খরচ দিতে হবে না। আবার কাউকে উপজেলা হাসপাতাল থেকে জেলা বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে যাওয়ার খরচও উপজেলা হাসপাতাল থেকে এসএসকে কার্যক্রমের আওতায় পরিশোধ করা হবে। কার্ডধারীরা বছরে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা খরচ সরকারের কাছ থেকে পাবে। তাদের প্রত্যেকের জন্য বিশেষ তহবিল থেকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় পরিবারপ্রতি এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম জমা দেবে সরকার। কার্ডধারীদের নিজেদের পকেট থেকে কোনো খরচ করতে হবে না।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘আজ স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নতুন করে মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের কোটি মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবে। যেখানে আমেরিকার কোটি কোটি মানুষ ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, সেখানে আমারা এ কাজ শুরু করেছি। ওবামা (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট) এই কাজ শুরু করেছিলেন। এ জন্য তিনি দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আমেরিকাতে এমন কর্মসূচিকে ওবামা হেলথ ইনস্যুরেন্স বলা হয়, বাংলাদেশে এখন থেকে এটা শেখ হাসিনার কর্মসূচি বলা হবে। কারণ তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার তিনটি কারণে আবারও নির্বাচিত হবে। সেগুলো হলো, ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, কোটি মানুষের ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেওয়া ও পদ্মা সেতু নির্মাণ।

অনুষ্ঠান শেষে তালিকাভুক্তরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাত থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির কার্ড নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরেন। এর আগে মন্ত্রী একই স্থানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গণসাক্ষরতা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। কালিহাতী পৌঁছে তিনি স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির বিশেষ সেবা বুথ উদ্বোধন করেন।


মন্তব্য