kalerkantho


পাঁচ মাসেই ২ কোটির মালিক রাজিবুল

আবুল কাশেম   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাঁচ মাসেই ২ কোটির মালিক রাজিবুল

রাজিবুল হাসানের বেতন তখন মোটে ১১ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া ও টিফিন ভাতা মিলিয়ে তা বড়জোর ২২ হাজারে পৌঁছায়।

মাসে এই পরিমাণ আয় নিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে ঢাকায় রাখার স্বপ্ন দেখেন না অনেকে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের নির্বাহী অফিসার রাজিবুল হাসান এক কোটি ৯৩ লাখ টাকার মালিক বনে যান মাত্র পাঁচ মাসে, নতুন কাঠামোয় দ্বিগুণ বেতন পাওয়ার আগেই। ফলে কেবল সপরিবারে ঢাকায় থাকা নয়, স্ত্রীর নামে ঢাকার রায়েরবাজারে কেনেন ১৩০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। বাসার ভেতরে বস্তায় আর টেবিলের ড্রয়ারে ফেলে রাখেন কোটি খানেক টাকা। মেয়াদি আমানতে নিজের নামে ব্যাংকে রাখেন ৪০ লাখ টাকা, আর শ্বশুরের নামে ২০ লাখ টাকার আমানত। তবে তা হজম করতে পারলেন না রাজিবুল।

মাত্র ৫৪ লাখ টাকা বকেয়া রেখে সবই পরিশোধ করতে হলো জনতা ব্যাংককে। বকেয়া অর্থ ফেরত দিতে সাদা কাগজে অঙ্গীকারনামায় সই করতে হলো শ্বশুর, স্ত্রী, ছোট ভাইসহ নিজেকে। স্ত্রীর নামে কেনা ফ্ল্যাটের দলিল ও চাবিও তুলে দিতে হলো ব্যাংকের কাছে।

ভবিষ্যতে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩০ লাখ টাকার একটি চেকও জমা করে রাখলেন জনতা ব্যাংকের কাছে। কারণ পাঁচ মাসে হাতিয়ে নেওয়া টাকাগুলো তাঁর রোজগার ছিল না, চুরি ও প্রতারণার মাধ্যমে তা আত্মসাৎ করেছিলেন। একই কায়দায় আরো টাকা আত্মসাৎ করেছেন কি না এবং আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তারাও জড়িত কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তাতে অন্যদের নাম বেরিয়ে এলে ২২ মার্চ রাজিবুলের নামে যে মামলা হয়েছে, তাতে যুক্ত হবে সেসব নামও। জনতা ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হাসান ইকবাল গতকাল বৃহস্পতিবার রাজিবুল হাসানের অর্থ চুরি নিয়ে এমডিস ভিজিল্যান্স ডিপার্টমেন্টের অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। তাতে তিনি বলেছেন, ‘আরো কোনো আত্মসাৎ বা অনিয়ম হয়েছে কি না, ব্যাংকের ভিজিল্যান্স ডিপার্টমেন্ট ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ আলাদাভাবে তদন্ত করে দেখছে। ’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাজিবুল হাসান কর্তৃক আরো কোনো টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে কি না, আরো কোনো অনিয়ম আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া এই আত্মসাতের সঙ্গে অন্য কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী, নির্বাহীর সম্পৃক্ততা আছে কি না এবং আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্ব নিরূপণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তদন্ত শেষে পেশ করা হবে। ’

রাজিবুল হাসান এত কিছুর মালিক হয়েছেন মাত্র দুটি ভুয়া সঞ্চয়ী হিসাব খুলে। ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে খোলা এসব হিসাব পরিচালনা করতেন রাজিবুল নিজেই। মেয়াদি আমানত থাকা বিভিন্ন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে সুদের অর্থ জমা না করে নিজের এসব ভুয়া অ্যাকাউন্টে জমা করার পর নগদে তুলে নিতেন রাজিবুল। এভাবেই ব্যাংকের বিভিন্ন গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে সুদ জমা না করে এক কোটি ৯৩ লাখ টাকা চুরি করে এই দুটি হিসাবে জমা করেন রাজিবুল। পরে পুরো টাকাই তুলে নেন চেকের মাধ্যমে, নিজের ভুয়া সই দিয়ে। জনতা ব্যাংকেই এমন আরো ১৫ থেকে ২০টি ভুয়া সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে তাঁর। সেগুলো চিহ্নিত করতে কাজ করছে তদন্ত কমিটি। ওই হিসাবগুলো চিহ্নিত করার পর আরো বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ছাড়া এ ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা বের করা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে জনতা ব্যাংক।

অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নির্বাহী অফিসার রাজিবুল হাসান ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসে যোগ দিলে শাখার আমানত বিভাগে পদায়ন করা হয়। পরে ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই তাঁকে শাখার এফডিআর ও ডেভেলপমেন্টের ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়। লোকাল অফিসে আমানত বিভাগে যোগদানের পর রাজিবুল হাসান ১৫ থেকে ২০টি ভুয়া সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন, যা তাঁর নিজ স্বাক্ষরেই পরিচালিত হয় এবং তা কোনো কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি। এই হিসাবগুলোর মধ্যে দুটি হিসাবের মাধ্যমে তিনি ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে এ বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত মোট এক কোটি ৯৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮০ টাকা আত্মসাৎ করেন। ’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমানের কাছে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে সঞ্চয়ী হিসাব দুটির বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, গুলশান ১ নম্বরের ১১৬ নম্বর রোড, ৫৬ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করে রাজিবুল হাসান একটি ভুয়া সঞ্চয়ী হিসাব (নম্বর-৩৪২২৯৪৯৫) খোলেন সুজন সিকদারের নামে। হিসাব ফরমে সুজন সিকদারের বাবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে ইউছুপ আলী সিকদার। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ওই হিসাবে প্রথম জমা হয় ৮৫ হাজার ৫৯০ টাকা। ওই বছরের ১২ নভেম্বর, ২২ নভেম্বর, ২৫ নভেম্বর এবং চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি, ৪ ও ৭ ফেব্রুয়ারি মোট সাত দফায় ওই হিসাবে জমা করা হয় ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার ৬৭১ টাকা। প্রত্যেকবার অর্থ জমা করার পরপরই রাজিবুল হাসান চেকে নিজে ভুয়া সই দিয়ে পুরো টাকাই তুলে নিতেন।

একইভাবে মো. জুলহাস উদ্দিন, পিতা আলাউদ্দিন আহমেদ, ঠিকানা-হাউস নং-১২০, রোড নং-১২৬, গুলশান-২, ঢাকা-এর নামে সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর ৩৪২৩০৭৬৭ (ভুয়া হিসাব) খুলে রাজিবুল নিজেই পরিচালনা করেন। এই হিসাবে গত বছরের ২৫ অক্টোবর প্রথম দুই লাখ ৮০ হাজার ৯৫৫ টাকা জমা হয়। গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত আরো ১০ দফায় মোট এক কোটি ৩৫ লাখ ২৮ হাজার ৪০৯ টাকা জমা হয় হিসাবটিতে। এ ক্ষেত্রেও পুরো টাকা রাজিবুল হাসান নিজের ভুয়া সই করা চেকের মাধ্যমে তুলে নেন।

জনতা ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আত্মসাৎ করা টাকার মধ্য থেকে এক কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে রাজিবুল হাসানের রায়েরবাজারের বাসার বস্তা থেকে গত ২০ মার্চ নগদ ৭৮ লাখ টাকা ও তাঁর ড্রয়ার থেকে ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। ২২ মার্চ তাঁর নিজ নামে থাকা মেয়াদি আমানত ও সঞ্চয়পত্র নগদায়নের মাধ্যমে ৪০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ওই দিন তাঁর ছোট ভাই ১০ লাখ টাকা সিলেট থেকে জনতা ব্যাংকে পাঠিয়েছেন। বাকি ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮০ টাকা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে রাজিবুল হাসানের শ্বশুরের নামে ২০ লাখ টাকার একটি ডাবল বেনিফিট স্কিমের মেয়াদি আমানত, তাঁর স্ত্রীর নামে রায়েরবাজারে ১৩০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা দলিলের সার্টিফায়েড কপি ও এসআরও টোকেন এবং ৩৫ লাখ টাকার একটি চেক শাখায় গচ্ছিত রেখে ৩০০ টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত অঙ্গীকারনামায় রাজিবুলসহ তাঁর শ্বশুর, স্ত্রী ও ছোট ভাই সই করেছেন।

এ ছাড়া অর্থ আত্মসাতের দায়-দায়িত্ব স্বীকার করে রাজিবুল হাসান লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়ে বলেছেন, এর বাইরে সংশ্লিষ্ট খাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রকার অনিয়ম উদ্ঘাটিত হলে সে দায় পরিশোধের জন্য তিনি বাধ্য থাকবেন।


মন্তব্য