kalerkantho


ব্রাসেলসে বোমা

৪০ দেশের নাগরিক আক্রান্ত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তাঁরা এসেছিলেন পেরু বা মরক্কো থেকে, উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপীয়ও ছিলেন কেউ কেউ। বৈচিত্র্য রয়েছে তাঁদের পেশায়ও—খেলোয়াড়, মিশনারি, ইউরোকর্মী।

তবে এখন তাঁরা এক কাতারে, এক তালিকায়—ব্রাসেলস হামলার হতাহত! মঙ্গলবারের ওই জোড়া জঙ্গি হামলায় অন্তত ৪০টি দেশের নাগরিক নিহত বা আহত হয়েছেন। এ তথ্য নগর ব্রাসেলসের চরিত্র ও গুরুত্ব—দুই-ই বোঝায়।

মঙ্গলবারের ঘটনার পর আতঙ্কে চুপসে যাওয়া ভাবটি এখনো কাটেনি ব্রাসেলসে। শহরটি এখনো নীরব।

রাষ্ট্রীয় শোক চলছে। চলছে তদন্তও। দুই আত্মঘাতী বোমারুর পরিচয় পাওয়া গেছে। এই দুই সহোদর আগে থেকেই দাগি। বিমানবন্দর ও পাতাল রেলে হামলায় হতাহতের সংখ্যা পুনর্মূল্যায়ন করে বেলজিয়ামের কর্মকর্তারা গতকাল জানান, নিহত হয়েছেন ৩১ জন আর আহত ২৭০।

গতকাল বিকেলে এক মিনিটের নীরবতা পালন করে বেলজিয়াম। দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে। একই সঙ্গে বহাল রয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সতর্কাবস্থা। ব্রাসেলসে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম গতকালও বন্ধ ছিল। খোলেনি পাতাল রেলস্টেশনটিও। তবে অন্যগুলো সীমিত পরিসরে হলেও কার্যক্রম শুরু করেছে। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত পাতাল রেল চালু রাখা হয়। ব্রাসেলস-লন্ডন ট্রেনও খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

কয়েকটি স্কুল খোলা ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশির ভাগ কর্মীই দপ্তরে যাননি। এক অস্ট্রেলীয় কূটনীতিক অ্যানটন জেইলিঙ্গার বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই ভীতিকর। কিছু বোমা হয়তো হামলাকারীরা ফাটাতে পারেনি। ওগুলো রয়ে গেছে। নিরাপত্তাকর্মীরাও হয়তো ওগুলোর সন্ধান পায়নি। যখন-তখন এগুলো বিস্ফোরিত হতে পারে। ’ অর্থাৎ সত্য-মিথ্যা নানা ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে শহরবাসীর মধ্যে। কাজের দিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা বা কর্মচাঞ্চল্য কিছুই ছিল না।

হতাহতের তালিকায় ৪০ দেশ : ব্রিটেন, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, ফ্রান্স, পর্তুগাল, যুক্তরাষ্ট্র—ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাদ দিয়েও নিহতের তালিকায় উঠে এসেছে এই দেশগুলোর নাম। প্রথম নাম ঘোষণা করা হয় পেরুর এক নারী আদেলমা মেরিনা তাপিয়া রুইজ। সাংবাদিক স্বামীর সঙ্গে তিনি ব্রাসেলসে বাস করছিলেন ছয় বছর ধরে। পাতাল রেলে হামলায় নিহত হন মরক্কোর এক নারী। বেলজিয়ামের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলা এটি। গুরুতর আহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিশনারি মেসন ওয়েলস (১৯)। দুর্ভাগা এই তরুণ তিন বছর আগে বোস্টনে তাঁর মায়ের সঙ্গে এক ম্যারাথন দৌড়েও অংশ নেন। সে দফাতেও আঘাত পান তিনি।

দুই ভাইয়ের পরিচয় শনাক্ত : আত্মঘাতী হামলায় দুই ভাই জড়িত ছিল বলে জানিয়েছে বেলজিয়ামের পুলিশ। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার এদের অতীত রেকর্ডও রয়েছে। এরা হলো ইব্রাহিম আল-বাক্রাওয়ি (৩০) এবং খালিদ আল-বাক্রাওয়ি (২৭)। বেলজিয়ামের নাগরিক। প্যারিস হামলার পর গত ১৫ মার্চ ব্রাসেলসের এক অ্যাপার্টমেন্টে অভিযান চালানোর পর এদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

ইব্রাহিম ও অপর এক ব্যক্তি মঙ্গলবার ব্রাসেলসের জাভেনতেম বিমানবন্দরে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। ৯ সেকেন্ড অন্তর বোমা দুটি বিস্ফোরিত হয়। খালিদ হামলা চালায় মালবিক পাতাল রেলস্টেশনের ট্রেনে। বিমানবন্দরের ঘটনার এক ঘণ্টা পর। বেলজিয়ামের কেন্দ্রীয় কৌঁসুলি ফ্রেডারিক ভ্যান লিউ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

তবে খালিদ বিমানবন্দর হামলায় ছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়। এ দুই ভাইকেই পুলিশ খুঁজছিল। পুলিশকে গুলি করার দায়ে ইব্রাহিমকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় ২০১০ সালে। ২০১১ সালে খালিদের বিরুদ্ধে গাড়ি চুরির অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার মাত্র চার দিন আগে গত শুক্রবার এই শহর থেকেই ধরা পড়ে প্যারিস হামলার একমাত্র জীবিত পরিকল্পনাকারী সালাহ আবদেসলাম। চার মাস ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল জঙ্গিগোষ্ঠী  ইসলামিক স্টেটের এই সদস্য। ওই দিন থেকেই নাজিম লাচরাওয়ি নামে এক ব্যক্তির খোঁজে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল পুলিশ। হামলার সঙ্গে সেও জাড়িত কি না জানা যায়নি। গতকাল এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর ধারণা করা হয়, সে-ই লাচরাওয়ি। পরে অবশ্য সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।  

বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যান জামবন গতকাল সকালে এক রেডিও সাক্ষাৎকারে বলেন, পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা বজায় থাকবে।

নিন্দা ঢাকার : আমাদের কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, বেলজিয়ামে গত মঙ্গলবারের জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী চার্লস মিশেলকে সেদিনই পাঠানো এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই নিন্দা জানান। তিনি ব্রাসেলস বিমানবন্দর ও পাতাল রেলস্টেশনে সন্ত্রাসী হামলায় অনেক নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুতে গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বেলজিয়ামের জনগণ ও সরকারের পাশে আছে। সন্ত্রাসীদের কোনো বর্ণ, ধর্ম ও বিশ্বাস নেই। সভ্য সমাজে সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। তিনি জঙ্গি হামলায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান।


মন্তব্য