kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


অনুকরণীয়

ঘুরে দাঁড়ানো বিদ্যায়তন

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঘুরে দাঁড়ানো বিদ্যায়তন

নতুন রূপে সাজছে রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ। ছবি : কালের কণ্ঠ

শ্রেণিকক্ষের সামনেই ঝুলন্ত টবে ফুলের গাছ। শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের কক্ষ, বাসভবন, কলেজ চত্বরেও বিভিন্ন জাতের ফুল ও ফলের গাছ। কলেজ মাঠের আশপাশে একসময়ের ভাগাড়ে শোভা ছড়াচ্ছে বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ। আর এসব গাছের পাশে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠছে শিক্ষার্থীরা। অথচ মাত্র এক বছর আগেও এসব ছিল কেবলই কল্পনা।

শিক্ষানগরী রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের বর্তমান চিত্র এটি। বর্তমান শিক্ষক-কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক দিকেই আসছে অভাবনীয় পরিবর্তন। আগে পেছনের সারির শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কোনো পাঠদানই নিতে পারত না। শিক্ষকরাও পেছনের সারির ছাত্রছাত্রীদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেতেন না। ফলে শিক্ষার মানও দিন দিন তলানির দিকে যাচ্ছিল। এখন শ্রেণিকক্ষে বসছে অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। এতে করে একসঙ্গে গোটা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীরা একই মাত্রায় শিক্ষকদের কথা শুনতে পাবে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য করা হচ্ছে গার্লস কেয়ার উইন্ডোজ। বলা যায়, উন্নয়ন আর ফুল-ফলে ভরে গেছে বছরের পর বছর ধরে উন্নয়নবঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ফিরে আসছে আলাদা মাত্রার প্রাণচাঞ্চল্য।

জানা যায়, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছে রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ। এখানে উচ্চ মাধ্যমিকে ১৭ ও স্নাতক বিষয়ে ১৫টি বিষয়ে মোট ৩২টি বিষয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে সাত হাজার শিক্ষার্থী। আর তাদের শিক্ষাদান করছেন ৭০ জন শিক্ষক।

কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান আসিফ মান্নান কালের কণ্ঠকে জানান, শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই কলেজটি চরম অবহেলিত ছিল। শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, শিক্ষকদের সেমিনার কক্ষ, অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষের কক্ষের ছাদ থেকেও কখনো মাথার ওপর খসে পড়ত পলেস্তারা। এতে করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অভিভাবকরাও আতঙ্কে থাকতেন। গত কয়েক মাসে সংস্কার করে পুরো কলেজটিকে এখন নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। ফিরে এসেছে শিক্ষার পরিবেশও।

শিক্ষক ড. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘ক্লাস রুমে একটু পেছনের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কথা শুনতে পেত না। এ থেকে রক্ষা পেতে বড় আটটি ক্লাসরুমে কর্ডলেস মাইক্রোফোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দরজা-জানালা সংস্কার করে শ্রেণিকক্ষের ভেতরেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্লাসরুমে মাল্টিমিডিয়ারও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে এখন আনন্দের সঙ্গেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা বসে পাঠে মনোযোগী হতে পারছে। ’

ছাত্রীদের কমন রুম সংস্কার করে সেখানে গার্লস কেয়ার উইন্ডোজ চালু করা হয়েছে। টিভি সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে মেয়েদের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ছাড়াও এখন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বিনোদনসহ দেশের বিভিন্ন খবরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে তারা।

কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান মফিজ উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘কলেজ গেট, সীমানাপ্রাচীর, মূল ভবনের বহিরাংশ ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় ছিল। এসব সংস্কার করে মানসম্পন্ন করা হয়েছে। কলেজের একমাত্র ফুলের বাগানটিরও কোনো পরিচর্যা ছিল না। এখন সেখানে ফুটেছে নতুন ফুল। পাশপাশি কোনো কোনো শ্রেণিকক্ষের সামনে ফাঁকা জায়গায়ও টবের মাধ্যমে ফুলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। কলেজ অডিটরিয়াম সুসজ্জিত ও অনুষ্ঠান উপযোগী করা হয়েছে।  

কলেজের স্নাতক শিক্ষার্থী আসমাউল হুসনা বলেন, ‘ছেলে ও মেয়ে হোস্টেলের সামনেটা জঙ্গলে ভর্তি ছিল। ফলে মাদক সেবন, চাঁদাবাজিসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনা লেগেই থাকত। কিন্তু এসব স্থানও ঢেলে সাজানোর কারণে সব অপকর্ম দূর হয়েছে। কড়া পাহারার কারণে বাইরের বখাটে-মাস্তানরাও এখন আর ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। ’

আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল বাকেয়া বলেন, ‘এক বছর আগেও কলেজে আসতে মন চাইত না। কিন্তু এখন এক দিন না এলেই মন খারাপ হয়ে যায়। ’

আরেক শিক্ষক আমেনা আবেদীন বলেন, ‘কলেজের ফাঁকা স্থানে নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। আরো ব্যাপক হারে লাগানো হবে। এতে করে পুরো ক্যাম্পাস ভরে উঠছে ফুল ও ফলগাছে। ’

কলেজ অধ্যক্ষ আর এস এম জার্জিস কাদির বলেন, ‘কলেজটি একসময় অনিয়ম-দুর্নীতিসহ চরম অব্যবস্থাপনায় ভরে ওঠে। ফলে এখানে ক্রমেই শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হতে থাকে। আমি এখানে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই ঐতিহ্যবাহী কলেজটিকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর পরিকল্পনা নিই। এরপর ২৬টি উন্নয়ন কমিটির মাধ্যমে কলেজটির সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষক-কর্মচারীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন। কারণ তাঁদেরও সবার উদ্দেশ্য ছিল কলেজটিতে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার। সেই লক্ষ্যে আমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছি। ’ তিনি আরো বলেন, এরই মধ্যে কলেজের আগের কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থও কলেজ কোষাগারে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আর এটিও কলেজের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে।


মন্তব্য