kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬ : সরেজমিন প্রতিবেদন

লাইনে ‘অলংকার ভোটার’ সবই নৌকার সমর্থক

বরিশাল

তৌফিক মারুফ, রফিকুল ইসলাম ও এস এম মঈনুল, বরিশাল থেকে   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লাইনে ‘অলংকার ভোটার’ সবই নৌকার সমর্থক

কেউ ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা, কেউ বা পাঞ্জাবির সঙ্গে লুঙ্গি। সবারই বয়স ষাট কিংবা এরও বেশি। কেন্দ্রের প্রবেশমুখেই প্রায় পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ গাল ভরে পান চিবোচ্ছেন, কেউ বা ফুঁকছেন সিগারেট। পরিচয় জানতে চাইলে এক গাল হেসে জবাব দিলেন, ‘এখন আমরা ভোটার, আর কোনো পরিচয় লাগবো না। ’ একজন গলা বাড়িয়ে বেশ ঠাট্টার ছলেই বলে উঠলেন, ‘বলতে পারেন আমরা এইখানের অলংকার ভোটার, রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়াইয়া বুথে গিয়া ভোট দেওয়ার কষ্ট করতে হয় নাই। পোলাপানেই সম্মান দেখাইয়া ওই কামডা কইরা ফালাইছে। ’ দুপুর সাড়ে ১২টায় এমন ‘অলংকার ভোটার’রা যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ঠিক তাঁদের মাথার ওপরেই দেখা গেল অংলকারকাঠি হাই স্কুলের সাইনবোর্ড। ভেতরে পুরো মাঠ ফাঁকা। কেবল একদল কিশোর ও উঠতি বয়সী ছেলেদের জটলা চোখে পড়ে দুটি বুথের দরজায়। হঠাৎ এক আনসার সদস্যের বাঁশির সতর্কবাণীতে স্কুল ভবনের পাশের আরেক পাশ দিয়ে পেছনের দিকে সরে গেল ওই ছেলেরা।

পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) উপজেলার স্বরূপকাঠি সদর ইউনিয়নের ওই কেন্দ্রের অল্প দূরে গাছপালার আড়ালে আরেক দলের জটলা দেখা গেল। সেদিকে এগিয়ে যেতেই প্রায় কান্নার স্বরে এক মধ্যবয়সী বলেন, ‘আরো প্রায় দুই ঘণ্টা আগে এখানকার ভোট শেষ হয়ে গেছে। বেশির ভাগ মানুষই নিজের ভোট নিজে দিতে পারেনি। নৌকা মার্কার প্রার্থী মো. আল আমিনের লোকজন কেন্দ্রটি দখল করে রেখেছে সকাল থেকেই। চেয়ারম্যানের দেখাদেখি তাঁর অনুসারী একজন মেম্বার প্রার্থীও একই স্টাইলে ভোট কেটেছেন। কেবল এই একটি কেন্দ্রেই নয়, ইউনিয়নের সব কেন্দ্রেই একই অবস্থা। চেয়ারম্যানের ব্যালটে নৌকা ছাড়া আর কোনোটায় ভোট দেওয়া যাচ্ছে না। তাও দেখিয়ে সিল মারতে হচ্ছে। ’

একই উপজেলার ভেতরে দেশের ঐতিহ্যবাহী পেয়ারা বাগান অধ্যুষিত আটঘর-কুরিয়ানা এলাকায় গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। কুরিয়ানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি বুথে ভেতরে ও বাইরে বেশ কিছু সময় জটলা করে অবস্থান করছিল ৩০-৪০ জন লোক। মাঠে কেউ নেই। সব ফাঁকা। ভেতর থেকে একজন হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে এসে মাঠের ওপার থেকেই হাঁক ছাড়েন, ‘ওই বেডারা, তোরা খাড়াইয়া দেহস কী? যা, বাকি বুুথে গিয়ে তারাতারি কামটা সাইর‌্যা ফালা। খালি হিসাবটা ঠিক রাহিস। ’

স্থানীয় এক রিকশাচালকের কাছে ওই লোকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খাইছেন তো মিয়া, আস্তে কথা কন, উনি তো আমাগো চেয়ারম্যান শেখর কুমার শিকদার, এইবারও নৌকা মার্কায় খাড়াইছেন। ’ এগিয়ে গিয়ে ওই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সঙ্গে পরিচিত হতেই অনেকটা বিব্রত হয়ে বলেন, ‘আরে আপনি এই রউদের মধ্যে ক্যান? চলেন ওই সামনের রাস্তার দিকে চায়ের দোকানে গিয়া কথা বলি। ’ চায়ে অসম্মতি জানালে তিনি বলেন, ‘দেখেন, আমি এই এলাকার খুব জনপ্রিয় চেয়ারম্যান। এলাকার যত উন্নয়ন, সব আমার আমলে অইছে। এইখানে যত মানুষ দেখেন সব আমার সমর্থক। সবাই আমারে ভালোবাসে। আমিও সবার জন্য জান-পরান দিয়া সেবা করি। এই যে দেখেন নিজে দাঁড়াই থাইক্যা এলাকাবাসীর ভোট দেওয়ার জন্য উৎসাহ জোগাই। এখানে কোনো গণ্ডগোল হবে না। পুরাটাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। ’

ওই চেয়ারম্যান প্রার্থী কিছুটা দূরে সরে যাওয়ার পর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার বলদিয়া মলুহার বিদ্যালয়ের শিক্ষক আতিকুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে ভোট আসলেই অনেকটা একতরফা হচ্ছে। কারণ চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্টই কেন্দ্রে আসেন নাই। তবে এখানে কোনো গণ্ডগোলও হয় নাই। ’

সকাল ১১টায় ঝালকাঠি সদর উপজেলার বিনয়কাঠি ইউনিয়নের সুগন্ধিয়া আলকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠও ফাঁকা পড়ে ছিল। বারান্দায় কেবল লাইনে দাঁড়িয়ে বুথে ঢোকার অপেক্ষায় ছিল ১০-১২ জন নারী-পুরুষ। প্রিসাইডিং অফিসার ঝালকাঠি সিভিল সার্জন অফিসের স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম কুমার দাস বলেন, ‘এখানে মোট ভোটার এক হাজার ৫৭৪ জন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন ১০ শতাংশ ভোটার। ’

এত কম কাস্টিং, আবার কেন্দ্রের ভেতরে ভোটারের উপস্থিতি না থাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রিসাইডিং অফিসার বলেন, ‘ভোট নিয়ে চিন্তা নাই। এখন ভোটার না থাকলেও পরে ঠিকই আসবে। কোনো গণ্ডগোল না হলেই হলো। ’

একই রকম ফাঁকা দৃশ্য দেখা যায় পাশের গাভা-রামচন্দ্রপুর এবং পাশের নবগ্রাম ইউনিয়নের কয়েকটি কেন্দ্রে। নবগ্রাম সেতু লাগোয়া হিমানন্দ দাশকাঠি স্কুল কেন্দ্র দেখিয়ে সেতুর ওপরে থাকা ওই ইউনিয়নের একজন প্রার্থীর কয়েকজন কর্মী জানায়, এই কেন্দ্রটিসহ এখানকার বেশির ভাগ কেন্দ্রেই নৌকা মার্কা ছাড়া অন্য কোনো চেয়ারম্যান প্রার্থীর এজেন্ট নেই।

এর আগে সকাল ৮টায় বরিশাল সদর উপজেলার পপুলাল স্কুলে নারী ও পুরুষ ভোটারদের ভিন্ন ভিন্ন দীর্ঘ লাইনের মাধ্যমে ভোট শুরু হলেও আধাঘণ্টা পরেই হঠাৎ করে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সাড়ে ৮টা নাগাদ বাইরের রাস্তায় দুই গ্রুপের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা শুরু হতে না হতেই ভোটার সেজে কেন্দ্রে প্রবেশ করা কয়েক যুবক প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে ঢুকে জোর করে ৩০০ ব্যালট, তিনটি সিল ও প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে প্রিসাইডিং অফিসার কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেন। ওই প্রিসাইডিং অফিসার বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষক এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনার পর পরই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘটনাটি জানানো হয়েছে।

এর ঘণ্টাখানেক পরেই ওই কেন্দ্রের অল্প দূরে বারু খায়ের কেন্দ্রের বাইরে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হলে তাৎক্ষণিক কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেন প্রিসাইডিং অফিসার এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে—এ আশঙ্কায় ভোট বন্ধ রেখেছি। তবে আশা করি কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার শুরু করা যাবে। ’

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরাদী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মকিমাবাদ নাজিমুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র। ভোটার, পোলিং এজেন্ট, এমনকি নির্বাচনী এজেন্ট—সবাই নৌকা প্রতীকের সমর্থক। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকলেও কেন্দ্রে ছিল না তাঁদের এজেন্ট। তবু ভোটারদের হাতে নৌকার ব্যালট পেপার পৌঁছায়নি। নির্বাচনী এজেন্টের হাত ঘুরে নৌকা প্রতীকের সেই ব্যালট গিয়ে পড়েছে বাক্সে। ইউপি সদস্য প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট বুকের এক পাশে নৌকার স্টিকার সেঁটেছেন।

ইউনিয়নের পাশের গ্রাম হলতা। সেখানে দুটি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর একটি ফজলুল হক মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অন্যটি শেরে বাংলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ দুটি কেন্দ্রের পরিবেশও প্রায় একই। সেখানে সবাই নৌকার সমর্থক। ভোট পড়ছে নৌকা প্রতীকে। তবে বুথের একজনই ভোটারদের কাছ থেকে চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যালট নিচ্ছেন, তাতে নৌকা প্রতীকে সিল দিচ্ছেন। নিজেই বাক্সে পুরছেন। ভোটাররা শুধু দুই সদস্য প্রার্থীর ব্যালটে গোপন বুথে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন।

শুধু এ তিনটি কেন্দ্রই নয়, ইউনিয়নের এন্তাজ মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বলইকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে একই পরিবেশ লক্ষ করা গেছে। সেখানকার ভোটার রাধা রানী মালী বলেন, ‘বাবা, মুই দুইড্যা ব্যালট পাইছি। চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যালট দেনাই। তয় মোর সামনেই নৌকায় সিল দেছে। ’ ওই কেন্দ্রের ভোটার আবুল হোসেন বলেন, ‘মেম্বার প্রার্থীর লইগ্যা ভোট দেতে আইছি। চেয়ারম্যান হ্যারা জ্যাগো দেয়। ’


মন্তব্য