kalerkantho

26th march banner

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সহায়তায় সম্পর্ক মজবুত হচ্ছে

ত্রিপুরা থেকে আজ আসছে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

আরিফুজ্জামান তুহিন   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিদ্যুৎ-জ্বালানি সহায়তায় সম্পর্ক মজবুত হচ্ছে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের অন্যতম ভিত হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহায়তা। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে তেল আমদানি শুরু হয়েছে গত ১৯ মার্চ। ভারতের ত্রিপুরা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হবে আজ বুধবার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। ওই সময় মোদির পাশে থাকতে পারেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও। এ ছাড়া ভারতের পূর্বাঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পেয়েছে ভারতের তিন বৃহৎ কম্পানি আদানি, রিলায়েন্স ও ওএনজিসি।

সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সম্পর্ক আরো জোরদার হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সময় যাচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী  নসরুল হামিদ জানান, ত্রিপুরা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হচ্ছে আজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।  

জানা যায়, ত্রিপুরা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে খরচ পড়বে প্রতি ইউনিট ছয় টাকা ৪৩ পয়সা (সাড়ে পাঁচ ভারতীয় রুপি)। ত্রিপুরা তাদের পালাটানা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট ভিত্তিতে। অর্থাৎ কেবল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ নিলেই মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এ বিদ্যুতেরও ক্যাপাসিটি চার্জ নেই (সর্বনিম্ন পরিমাণ বিদ্যুৎ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা, যা না নিলেও দাম দিতে হয়)। তবে সঞ্চালন চার্জ থাকবে। ত্রিপুরার সঞ্চালন লাইনের জন্য সে দেশের সরকার এবং বাংলাদেশের মধ্যকার সঞ্চালন লাইনের জন্য বাংলাদেশ সরকার সঞ্চালন ব্যয় নির্বাহ করবে।

গত ১৬ ডিসেম্বরেই এই বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দামের বিষয়টি ফয়সালা না হওয়ায় তখন বিদ্যুৎ আসেনি। গত ৯ জানুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের ঊর্ধ্বতন সরকারি পর্যায়ের এক সভায় দামের বিষয়টির ফয়সালা হয়।

ত্রিপুরা রাজ্যের গোমতী জেলার পালাটানায় স্থাপিত ৭২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আখাউড়া সীমান্ত হয়ে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসবে। এ জন্য পালাটানা থেকে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন করেছে ভারত। আবার বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন করেছে পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের নীতি হলো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা এবং এ অঞ্চলের সম্পদ ব্যবহারে একটি ঐকমত্য তৈরি করা। এরই অংশ হিসেবে আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছি, দেশটির জলবিদ্যুতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা খুঁজছি। এটি বহু আগে ইউরোপের দেশগুলো করেছে, আমরা এখন শুরু করেছি। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ। এটি একে অন্যের সহযোগিতার কারণে হয়েছে।

বর্তমানে ভারত থেকে ভেড়ামারা দিয়ে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এই ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ২৫০ মেগাওয়াটের দাম পড়ছে প্রতি ইউনিট দুই রুপি ৪৬ পয়সা। বাকি ২৫০ মেগাওয়াট বেসরকারিভাবে নেওয়া হচ্ছে, যার দাম প্রতি ইউনিট পাঁচ রুপি ৪৬ পয়সা। আরো ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ আছে। এ বিদ্যুতে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ নেই। অর্থাৎ বিদ্যুৎ না দিলে কোনো টাকা দিতে হবে না। আর বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম গড়ে সাড়ে ছয় টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও কেন্দ্রগুলোকে সরকার ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে থাকে।

বিদ্যুৎ জ্বালানিতে বাড়ছে পারস্পরিক সহযোগিতা : ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে হিমালয় থেকে যেসব নদী উৎপন্ন হয়ে এসেছে সেগুলোতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার মেগাপ্রজেক্ট হাতে নিয়েছে দেশটি। প্রায় সাড়ে তিন শ বাঁধের মাধ্যমে ওই অঞ্চল থেকে দেড় লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই। এ কারণে বাংলাদেশের কাছে বিদ্যুতের করিডর চেয়েছে ভারত। প্রাথমিকভাবে সাত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের করিডর হবে যা বাংলাদেশের দিনাজপুরের মধ্য দিয়ে ভারতের মুর্শিদাবাদে গিয়ে উঠবে। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ থেকে বাংলাদেশ করিডরের মাসুল হিসেবে একটি অংশ পাবে বিনা মূল্যে। এখান থেকে কম দামে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগও পাচ্ছে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা  ড. মশিউর রহমান সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের এক চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সুযোগ আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগকে সেখানে ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলের জলবিদ্যুতে এই বিনিয়োগ হলে এর সুফল পাবে বাংলাদেশ। ১০০ কোটি ডলারে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে। আর ওই বিদ্যুতের দাম হবে এক টাকারও নিচে।

এ ছাড়া নেপাল থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আমদানি করতে চায়। বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য ভারতের ভূমি ব্যবহার করতে হবে। ভারত এরই মধ্যে তাদের ভূমি ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়েছে।

বাংলাদেশে তেল শোধনাগারটির ক্ষমতা বছরে মাত্র ১৫ লাখ টন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলেও এর খুব বেশি সুফল নিতে পারে না বাংলাদেশ। ভারতের লুমিনিগড় থেকে বছরে ১০ লাখ টন তেল আমদানি করবে বাংলাদেশ। পাইপলাইনের মাধ্যমে এ তেল আমদানি করা হবে। ১৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের জন্য শিগগিরই চুক্তি সই হবে। গত ১৯ মার্চ ভারত থেকে রেলপথে তেল আমদানি শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুই হাজার ২০০ টন তেল আমদানি হয়েছে।

জানা গেছে, ভারতের দুই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ও আদানি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ১১ বিলিয়ন বা এক হাজার ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া বাগেরহাটের রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যৌথভাবে নির্মাণ করছে বাংলাদেশ ও ভারত। যদিও এ কেন্দ্রটি নির্মাণে পরিবেশবাদীদের বিরোধিতা রয়েছে।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের অগভীর সমুদ্রের ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ দেওয়া হয় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানি অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশনকে (ওএনজিসি)। এতে ওএনজিসির সঙ্গে যৌথভাবে (ক্যারিড ইন্টারেস্ট) থাকছে দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স।


মন্তব্য