kalerkantho


ফিচার

পাড়াতলীর কবির বাড়ি

আপেল মাহমুদ   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাড়াতলীর কবির বাড়ি

কবি শামসুর রাহমানের পৈতৃক বাড়ি। ধ : কালের কণ্ঠ

ঢাকা থেকে বাসযোগে বারৈচা। সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজিচালিত যানে রায়পুরা মেঘনা নদীর পাড়।

এর নতুন নামকরণ হয়েছে পান্থশালা ফেরিঘাট। নদী পেরিয়ে সায়দাবাদ গ্রামের ওপর দিয়ে বালুয়াকান্দি বাজার হয়ে সোজা পাড়াতলী। মেঘনাবিধৌত এই গ্রামেই ব্রিটিশ আমলে নির্মিত চুন-সুরকির পলেস্তারা খসে যাওয়া চৌধুরী বাড়ি। তবে এই বাড়ির খ্যাতিটা এক বিশেষ জায়গায়—এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমানের (১৯২৯-২০০৬) পৈতৃক ভিটা। কবির দাদা কলিম উদ্দিন চৌধুরীর আমলে নির্মিত বাড়িটিতে বর্তমানে কবির ঔরসজাত কেউ থাকেন না। ফলে সর্বত্র অযত্ন-অবহেলার ছাপ।

কবি শামসুর রহমানের জন্ম পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে। তবে মেঘনা পারের গ্রাম পাড়াতলীর স্মৃতি কখনো বিস্মৃত হননি তিনি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কবি পাড়াতলীর বাড়িতে বেশ কিছুদিন ছিলেন।

সেখানে বসে লিখেছেন বেশ কিছু কালজয়ী কবিতা। বাড়ির পাশেই রয়েছে একটি দিঘি। সে সময় কবি এই দিঘির পাড়ে বসে সময় অতিবাহিত করতেন। সেখানে বসেই লিখেছিলেন ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতাসহ আরো কিছু উল্লেখযোগ্য রচনা।

এই দিঘির সঙ্গে কবির একটি বেদনাবিধুর স্মৃতি রয়েছে। তাই কখনো বাড়িতে গেলে তিনি সে স্মৃতি স্মরণ করে বিষণ্ন হয়ে যেতেন। কবির ছোট ছেলে ওয়াহিদুর রাহমান মতিন শিশু বয়সে এই দিঘির পানিতে ডুবে মারা যায়। তাকে বাড়ির পাশেই কবর দেওয়া হয়েছে। পরে কবির বাবা মুখলেছুর রহমান চৌধুরী মারা গেলে তাঁকেও ছোট ছেলের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়। ছোট ছেলের করুণ মৃত্যু কবিকে আজীবন তাড়িত করেছে। তিনি লিখেছেন—‘তোর কাছ থেকে দূরে/সে কোন নিশ্চিন্তপুরে পালাতে চেয়েছি/প্রতিদিন বুঝলি মতিন। ’ ওয়াহিদুর রাহমান মতিন ছাড়াও কবির আরো চার সন্তান—সুমায়রা আমিন, ফাইয়াজ রাহমান, ফাওজিয়া সাবেরীন ও শেবা রাহমান।

বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই রয়েছে একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটি ১২৯৯ হিজরিতে কবির পূর্বপুরুষরা নির্মাণ করেন। মসজিদের গম্বুজ দূর থেকেই চোখে পড়ে। বাড়ির পাকা ভবনটি ছয় কক্ষবিশিষ্ট। বর্তমানে কবির চাচাতো ভাই ফাইজুর রহমান ও তাঁর পরিবার বাড়িতে বসবাস করছে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ফাইজুর রহমান বলেন, ‘চাচা মুখলেছুর রহমানের মাহুতটুলীর বাড়িতে প্রায়ই যেতাম। সেখানে কবির সঙ্গে অনেক কথা হতো। কবি পাড়াতলীর বাড়িতে এলে তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে এখানে সেখানে বেড়াতে যেতাম। তাঁর শৌখিন ও ভদ্র আচরণের কথা আমি কখনো ভুলব না। আর তাঁর মতো ভদ্র ও নির্লোভ মানুষ আর দেখিনি। ’

তরুণ লেখক মাইনুল রহমান খানের বিবরণ থেকে জানা যায়, কবির বাবা ব্রিটিশ আমলে পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রচুর অর্থ রোজগার করেন। তিনি পাড়াতলী বাড়ির পাশে বাবা কলিম উদ্দিন চৌধুরীর নামে ১৯৬০ সালে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে কবির নামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। অথচ লাইব্রেরি ভবনটিতে কবির কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। নেই তাঁর সব বই-পুস্তকও। এমনকি সেখানে কবির কোনো ছবি পর্যন্ত নেই। ভবনের ভেতরে রয়েছে কয়েকটি ধূলিময় ডেস্ক, গুটিকয়েক প্লাস্টিকের চেয়ার এবং থাই গ্লাসের ভাঙা অংশবিশেষ।

নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে জন্ম না হলেও পৈতৃক ভিটার প্রতি শামসুর রহমানের আলাদা একটা টান ছিল। রাজধানীর শ্যামলীর বাড়িতে কেউ গেলে তিনি তাদের আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানাতেন। একবার নরসিংদী জনকল্যাণ সমিতির সদস্যরা তাঁর বাড়িতে গেলে তিনি তাদের নিজ হাতে আপ্যায়ন করেন। তাদের বসিয়ে রেখেই সমিতির বার্ষিকীর জন্য ‘পাড়াতলী গ্রামে যাই’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখে দেন। কবির স্বহস্তে লেখা কবিতাটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়।


মন্তব্য