kalerkantho


নাগরিকত্ব পেতে বিনিয়োগ দ্বিগুণ করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নাগরিকত্ব পেতে বিনিয়োগ দ্বিগুণ করতে হবে

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে বিদেশিদের জন্য বিনিয়োগের পরিমাণ দ্বিগুণ করে ‘জাতীয় শিল্পনীতি, ২০১৬’ অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করলে বা ২০ লাখ ডলার কোনো স্বীকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবেন।

আগের নীতিমালায় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ডলার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা অর্থের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ডলার।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন শিল্পনীতি অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে শিল্পনীতি ছাড়াও ‘সেনানিবাস আইন, ২০১৬’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ‘শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট (সংশোধন) আইন, ২০১৬’-এর খসড়া ভেটিং সাপেক্ষে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, শিল্পনীতিতে বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী ১০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে বা ২০ লাখ ডলার কোনো স্বীকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করলে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবেন।

বিদেশি বিনিয়োগকারীকে স্থায়ী রেসিডেন্টশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে কমপক্ষে ৭৫ হাজার ডলার বিনিয়োগের যে শর্ত রয়েছে, তা বাড়িয়ে দুই লাখ ডলার করা হবে। সম্ভাবনাময় বিদেশি বিনিয়োগকারীকে ন্যূনতম পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা দেওয়া হবে।

মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, নীতিতে রয়েছে সবুজ বা উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন, উদ্ভাবনীমূলক এবং যেসব শিল্পের দক্ষতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সম্ভাবনা রয়েছে সেসব শিল্পে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে, তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ থাকবে।

শিল্পায়নের গতি সঞ্চারে বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণে বিশেষ প্যাকেজ সুবিধা দেওয়া হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শিল্প বিনিয়োগ সহজীকরণের ইনটিগ্রেটেড ওয়ানস্টপ সার্ভিস সুবিধা নিশ্চিত করা হবে বলে নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদকে নতুন নীতি বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ৪০ সদস্যের এ পরিষদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী। পরিষদকে সহায়তা করবে জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদের নির্বাহী কমিটি। এ কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন শিল্পমন্ত্রী। ২০১০ সালের নীতি হালনাগাদ করে নতুনভাবে শিল্পনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। আগের নীতির ধারাবাহিকতা এতে অক্ষুণ্ন আছে। শিল্পনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আগের মতোই আছে।

নতুন নীতিতে বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের সংজ্ঞায় অর্থের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। উৎপাদশীল ক্ষেত্রে মূলধন ৫০ কোটি টাকার বেশি ও ৩০০ জনের বেশি শ্রমিক যেখানে কাজ করে সেটিকে বৃহৎ শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেবা শিল্প খাতের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যেখানে স্থায়ী সম্পদের মূল্য ব্যয়সহ ৩০ কোটি টাকার বেশি কিংবা যেসব প্রতিষ্ঠানে ১২০ জনের বেশি শ্রমিক নিয়োজিত সেটা বৃহৎ শিল্প। উৎপাদনশীল শিল্পের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ ১৫ কোটি টাকার বেশি হলে ও ১২১ থেকে ৩০০ জন শ্রমিক নিয়োজিত থাকলে তা হবে মাঝারি শিল্প। আর সেবা শিল্পের ক্ষেত্রে মাঝারি শিল্পে দুই থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন এবং শ্রমিক থাকতে হবে ৫১ থেকে ১২০ জন। ক্ষুদ্র শিল্পের সংজ্ঞায় নীতিতে বলা হয়েছে, উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে ৭৫ লাখ টাকা থেকে ১৫ কোটি টাকা মূলধন কিংবা যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ৩১ থেকে ১২০ জন শ্রমিক কাজ করে তা হবে ক্ষুদ্র শিল্প। সেবা শিল্পের ক্ষেত্রে ১০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন কিংবা ১৬ থেকে ৫০ জন শ্রমিক থাকতে হবে। যেখানে মূলধন ১০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা কিংবা যে শিল্পে ১৬ থেকে ৩০ জন বা এর চেয়ে কম লোক কাজ করে তা হবে মাইক্রো শিল্প। কুটির শিল্প হচ্ছে যেখানে পরিবারের সদস্য নিজেরাই শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালায়। কারুশিল্পীর শৈল্পিক মনন ও শ্রমের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে যে শিল্প নতুন নীতি অনুযায়ী তাই হস্ত ও কারুশিল্প। নীতিতে নারী উদ্যোক্তার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যদি কোনো নারী ব্যক্তি মালিকানাধীন বা প্রোপাইটরি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বত্বাধিকারী বা প্রোপাইটররা, অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫১ শতাংশ অংশ থাকে তবে সেটিকে নারী শিল্প উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হবে।

দেশের গতিশীল শিল্পায়ন ও টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে কিছু প্রণোদনা দেওয়ার কথা নীতিতে বলা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, প্রণোদনার মধ্যে রয়েছে মূলধনী বিনিয়োগের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকি, উৎপাদিত পণ্যের ওপর থেকে কর ও শুল্ক অব্যাহতি, অ্যাক্রেডিটেশন সনদের ফি চার্জ ও বীমা স্কিমের প্রিমিয়ামের খরচ পুনর্ভরণের ব্যবস্থা এবং চলতি মূলধনের সুদের ওপর ভর্তুকি। এলাকাভেদে বিভিন্ন শিল্প খাত-উপখাত বিদ্যমান আয়কর বিধি-বিধান অনুযায়ী কর অবকাশ ও অবচয় সুবিধা পাবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানি করা কাঁচামালের শুল্ক ও কর হার সম্পূর্ণরূপে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও কর হার থেকে কম হবে বলেও নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিল্প ক্লাস্টার ও শিল্প পার্কের অবকাঠামো, অনুন্নত এলাকায় স্থাপিত শ্রম নিবিড় শিল্পের উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উদ্যোগে সম্পদ বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ উদ্দেশ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাসজমি ও চরাঞ্চলের ভূমি নিয়ে একটি ল্যান্ড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠায় ল্যান্ড ব্যাংক থেকে ভূমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে। নারী শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রাক-বিনিয়োগ পরামর্শ, প্রকল্প প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন ও উদ্বুদ্ধকরণে সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে নতুন শিল্পনীতিতে।

বৈঠক শেষে একজন সিনিয়র মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে জানান, ‘সেনানিবাস আইন, ২০১৬’-এর খসড়া নিয়ে সেনা, নৌ ও বিমান—তিন বাহিনীরই আপত্তি রয়েছে। তারা লিখিতভাবেই আপত্তির কথা জানিয়েছে। এ কারণেই নীতিগতভাবে অনুমোদিত হলেও তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবার মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।


মন্তব্য