kalerkantho


পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র

ক্ষতিপূরণের মডেল

আরিফুজ্জামান তুহিন   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্ষতিপূরণের মডেল

এই নকশার বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হবে ক্ষতিগ্রস্তদের

সিলেটের চুনারুঘাটে কিছু ব্যক্তিগত জমি ও বাকিটা সরকারি জমি মিলিয়ে সেখানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (সেজ-স্পেশাল ইকোনমিক জোন) গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয় সরকার। এ প্রকল্পের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের জন্য সিলেটের জেলা প্রশাসক আগেভাগে ক্ষতিপূরণসহ বেশ কিছু প্যাকেজ ঘোষণা করেন। তবে এসবে স্থানীয় চা শ্রমিক ও কৃষকদের মন গলেনি। এখানে ইপিজেড নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয়রা।

২০১১ সালে ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিলে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার পরিকল্পনা নেয় সরকার। বিমানবন্দরটি নির্মিত হলে বাংলাদেশে কানেকটিং ফ্লাইটের রুটের জন্য বহু বিদেশি বিমান কম্পানি এখানে ব্যবসা খুলত। বিক্রি হতো বেশি দামের জ্বালানি তেল। বহু ধরনের ব্যবসা ও বিনিয়োগের পথ খুলে যেত বিমানবন্দরটি ঘিরে। এর বিরুদ্ধেও আন্দোলনে নামে স্থানীয় জনগণ। তাদের বক্তব্য, ‘জীবন দেব তবু জমি দেব না। ’ শেষ পর্যন্ত সহিংস আন্দোলনে গ্রামবাসীর হাতে নিহত হলেন এক পুলিশ সদস্য। সরকার বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

যেখানেই সরকার উন্নয়নকাজের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করেছে সেখানকার গল্প প্রায় সবই মোটামুটি এ রকম। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল ‘ক্ষতিপূরণের টাকা বা অন্যান্য শর্ত তাদের বঞ্চিত করবে। ’ কিন্তু সম্প্রতি একটি উন্নয়ন প্রকল্প দেখিয়েছে অন্য রকম এক দৃশ্য। সেখানে কোনো আন্দোলন নেই। জমি উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্তের পক্ষে নেই উচ্চ আদালতে কোনো রিট বা রাজপথে প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন সহযোগে মানববন্ধন বা বিক্ষোভ। উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ চলছে পটুয়াখালীর পায়রাতে। সেখানে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।

জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি চীনের সঙ্গে পায়রাতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ জন্য ১৩২টি পরিবারের প্রায় এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এর মধ্যে সরকারি খাসজমিও ছিল। এখান থেকে উচ্ছেদ হয়ে ঘরবাড়ি হারানো ১৩২ পরিবারের জন্য একটি আধুনিক গ্রাম তৈরি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এই কেন্দ্রে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবেও স্থানীয়রা চাকরি পাবে। সেই সঙ্গে এ প্রকল্পের লাভের ভাগীদারও হবে ক্ষতিগ্রস্তরা। যে প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হয়েছে তা অনুকরণীয় বলছেন অনেকেই। দেশের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এটি একটি মডেলও—বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এটির লভ্যাংশের অর্থ দিয়ে একটি তহবিল গঠনের নির্দেশ দেন। পরে মন্ত্রিসভা এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের মানুষও কেন্দ্রের লভ্যাংশর অংশীদার হবে।

জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে গিয়ে পটুয়াখালীর পায়রার মধুপাড়া, নিশানবাড়িয়া, দশরহাউলা, মরিচবুনিয়া গ্রামের ৯৮২ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এখানকার পরিবারগুলোর বসতভিটার জন্য একরপ্রতি সাড়ে সাত লাখ টাকা এবং নাল জমির জন্য পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের ঘরবাড়ির জন্যও অর্থ দেওয়া হয়েছে। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের হিসাবে, মোট ৬৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। খাসজমি থেকে যারা উচ্ছেদ হয়েছে তাদেরও বাসস্থান, চিকিৎসা এবং তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানির বোর্ড প্রকল্পটি অনুমোদন করে দিয়েছে। এ জন্য ব্যয় হচ্ছে ৬০ কোটি টাকা।

জানা যায়, যেসব পরিবার ২০ ডেসিমলের কম জমি হারিয়েছে তারা প্রত্যেকে পাবে ছয় ডেসিমল জমি, সঙ্গে একটি সেমিপাকা বাড়ি। যারা ২০ ডেসিমলের বেশি জমি হারিয়েছে তারা পাবে ৮ ডেসিমল জমি সঙ্গে এক হাজার ২০০ বর্গফুটের সেমিপাকা বাড়ি। আর এসব বাড়িতে থাকবে আধুনিক সব ব্যবস্থা। এ অঞ্চলে এখন বিদ্যুৎ নেই; কিন্তু নতুন সেমিপাকা বাড়িতে থাকবে বিদ্যুৎ। চারটি সেমিপাকা বাড়ি ব্যবহারকারীরা একসঙ্গে একটি উঠানও পাবে।

পটুয়াখালীর পায়রা এলাকার চরের মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র—এমনটি দাবি কর্তৃপক্ষের। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোকে শুধু সেমিপাকা বাড়িই নির্মাণ করে দিচ্ছে না তারা, একই সঙ্গে সেখানে থাকবে কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, ঈদগাহ, অফিস কাম কমিউনিটি সেন্টার, শিশুদের জন্য থাকবে স্কুল, খেলার মাঠ, পুকুর। এ ছাড়া গ্রামের মধ্যেই গো চারণ ক্ষেত্র তৈরি করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্ছেদ শব্দটি অত্যন্ত বেদনার। আমরা সেই বেদনা অনুভব করার চেষ্টা করেছি। এ কারণে জমির অর্থ মূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার জন্য আলাদা করে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এখানে সেমিপাকা বাড়ি করে দেওয়া হবে ১৩২টি পরিবারকে। যেখানে আধুনিক সব সুবিধাই থাকবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের খুব কাছেই প্রকল্পটি করা হচ্ছে। যাতে তারা কেন্দ্রটিতে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারে।

এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি। ২০১৪ সালে সই হওয়া ওই এমওইউর আলোকে একটি যৌথ মূলধনী কম্পানি গঠন করা হয়। এর মালিকানা সমান সমান থাকবে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন ও সিএমসির। চলতি মাসের ২৯ তারিখে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে এনইপিসিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তির বিষয়ে সম্মতিপত্র দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।


মন্তব্য