kalerkantho


চলে গেলেন চিত্রনায়িকা দিতি

দাউদ হোসাইন রনি   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চলে গেলেন চিত্রনায়িকা দিতি

চলেই গেলেন পারভীন সুলতানা দিতি। গতকাল বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই নন্দিত অভিনেত্রী (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। হাসপাতালের চিফ কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট শাগুফা আনোয়ার তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন।

অসুস্থতা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন—এমন আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন দিতির ছেলে দীপ্ত ও মেয়ে লামিয়া। এর পরও ‘অলৌকিক’ কিছুর প্রত্যাশা ছিল তাঁদের। অবশেষে স্বজন আর শুভানুধ্যায়ীদের কাঁদিয়ে চলেই গেলেন তিনি।

দিতির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোক বার্তায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে দিতির অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি। খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে চলচ্চিত্র অঙ্গন ও ভক্তদের মাঝে। মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর গতকাল অনেকেই দিতিকে শেষ দেখা দেখতে হাসপাতালে ভিড় করেন।

সহকর্মীদের মধ্যে ববিতা, সুবর্ণা মুস্তাফা, ইলিয়াস কাঞ্চন, মৌসুমী, ওমর সানী, মিশা সওদাগরসহ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকজন শিল্পী হাসপাতালে যান। গুলশানের আজাদ মসজিদে গতকাল বাদ এশা দিতির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরদেহ ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়।

অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা দিতির পরিবারের পক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, আজ সকাল ৮টায় দিতির গুলশানের বাসার সামনে দ্বিতীয়বারের মতো জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় দুই সন্তান দীপ্ত ও লামিয়া প্রচারমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়। দিতির শেষ ইচ্ছানুযায়ী সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হবে।

গত বছর দিতির মস্তিষ্কে ক্যান্সার ধরা পড়ে। ২৫ জুলাই ভারতের চেন্নাইয়ের ‘মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব অর্থোপেডিকস অ্যান্ড ট্রমাটোলজি’তে (এমআইওটি) তিনি ভর্তি হন। ২৯ জুলাই তাঁর মস্তিষ্কে প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। টানা দুই মাস নিতে হয় কেমোথেরাপি। কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন ২০ সেপ্টেম্বর। দেশে ফিরে মাসখানেক সুস্থই ছিলেন। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এরপর আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৩০ অক্টোবর তাঁকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে। অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় চার দিন পর আবারও তাঁকে চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ৫ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়। মস্তিষ্কে জমে থাকা পানি অপসারণ করেন চিকিৎসকরা। তবু ঝুঁকিমুক্ত হননি। এ অবস্থায় নিকটাত্মীয় ও স্বজনদেরও চিনতে পারছিলেন না তিনি। চেন্নাইয়ের চিকিৎসকরাও হাল ছেড়ে দেন। ৮ জানুয়ারি তাঁকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে। মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি।

১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) আয়োজিত ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে সম্পৃক্ত হন দিতি। প্রথম সুযোগ পান উদয়ন চৌধুরীর ‘ডাক দিয়ে যাই’ ছবিতে। কিন্তু ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। দ্বিতীয় ছবি আজমল হুদা মিঠুর ‘আমিই ওস্তাদ’ দিয়ে প্রথমবার পর্দায় আসেন তিনি। এরপর অভিনয় করেছেন দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে। গত মাসে মুক্তি পায় দিতি অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘সুইট হার্ট’। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে ‘ধূমকেতু’।

দিতি অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—দুই জীবন, হীরামতি, ভাই বন্ধু, চরম আঘাত, খুনের বদলা, স্বামী স্ত্রী, আজকের হাঙ্গামা, মানুষ, লেডি ইন্সপেক্টর, শেষ উপহার, কালিয়া, দুর্জয়, স্নেহের প্রতিদান, উছিলা, শেষ উপহার, প্রিয় শত্রু, চার সতীনের ঘর, মুক্তি, মাটির ঠিকানা, নয় নম্বর বিপদ সংকেত, জোনাকির আলো ইত্যাদি।

সুভাষ দত্তের ‘স্বামী স্ত্রী’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান এই অভিনেত্রী।

নায়িকা চরিত্রে অভিনয় থেকে বিরতি নেওয়ার পর তিনি অভিনয় করেছেন অসংখ্য টিভি নাটক ও টেলিফিল্মে। মডেলিংও করেছেন বেশ কিছু পণ্যের। গাইতেও পারতেন দিতি। তাঁর একক অ্যালবাম রয়েছে দুটি।

অসুস্থ হওয়ার আগে দিতি দুটি নতুন ধারাবাহিক নাটকে কাজ করছিলেন। একটি ‘লাইফ ইন আ মেটো’, অন্যটি ‘মেঘে ঢাকা শহর’। পাশাপাশি বদিউল আলম খোকন পরিচালিত ‘রাজা বাবু’ ছবির কাজও করছিলেন তিনি।

১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন দিতি। সহকর্মী সোহেল চৌধুরীকে ভালোবেসে বিয়ে করেন ১৯৮৬ সালে। নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। ১৯৯৮ সালে বনানীতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন সোহেল চৌধুরী। এর কয়েক বছর পর পর্দাজুটি ইলিয়াস কাঞ্চনকে বিয়ে করেন। সে বিয়েও একপর্যায়ে ভেঙে যায়।


মন্তব্য