kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬ : সরেজমিন প্রতিবেদন

‘নৌকার ভোট ওপেনে, বাকিগুলা গোপনে

তৌফিক মারুফ ও রফিকুল ইসলাম, বরগুনা থেকে   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘নৌকার ভোট ওপেনে, বাকিগুলা গোপনে

আমতলী থেকে বরগুনায় ঢোকার সময় উত্তাল নদীর মাঝে ট্রলারে বসেই বরগুনার এক যাত্রী ভোটের প্রসঙ্গ তুলে বললেন, “এমনিতেই ভোট দিতে কতজন যায় তা নিয়ে আগে থেকেই শঙ্কায় ছিলাম। আর এখন তো নৌকা মার্কার লোকজন প্রকাশ্যেই বলে দিচ্ছে ‘নৌকার ভোট ওপেনে—বাকিগুলা গোপনে। ’ যদি তাই হয়, তবে আর ভোটের থাকলটা কী!”

কী থাকল তা বোঝা গেল বরগুনার তীরে পা রেখেই। বড় পায়রায় বিচ্ছিন্ন জেলা আর উপজেলা। পশ্চিম পারে বরগুনা জেলা আর পূর্বে আমতলী উপজেলা। দুই পারেই নির্বাচন। তবে পরিবেশ বলছে ভিন্ন কথা। আমতলীতে সাজ সাজ রব। সমানে চলছে প্রচারণা। পশ্চিম পারে সুনসান নীরবতা। শুধু এক চেয়ারম্যান প্রার্থীর পোস্টারে ছেয়ে আছে ফেরিঘাট। দেখলে মনে হবে ইউনিয়নে প্রার্থীই একজন। ঘাটের বেশ কয়েকজন দোকানি জানাল, এই ইউনিয়নে একজনই প্রার্থী ছিলেন। তিনি কোনো প্রার্থীকেই মনোনয়নপত্র দাখিল করতে দেননি। বিধি অনুযায়ী, তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতও হয়েছিলেন। গরু কেটে বিজয় উল্লাসও করেছিলেন। কিন্তু সপ্তাহখানেক ধরে শুনছি আরো দুজন আদালতের নির্দেশে প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা ওই প্রার্থীর ভয়ে প্রচারণাই করেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ওরফে ভায়রা সিদ্দিক বুড়িরচর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান। দলীয় প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রার্থীকে তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করতে দেননি। ফলে বিধি অনুযায়ী সিদ্দিকুর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর দুই প্রার্থী উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। শেষমেশ আদালত তাঁদের নির্বাচনে ফিরে আসতে সাহায্য করেন। কিন্তু এলাকায় ঘুরে তাঁদের কোনো পোস্টার কিংবা নির্বাচনী ক্যাম্প চোখে পড়েনি।

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইকবাল মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর লোকজন ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন না। শুধু বলছেন, ‘ভোট দিলে দেখিয়ে দিতে হবে, না হলে ভোট দিতে আসবেন না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘কেন্দ্রে কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট যাদের দেব তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা হুমকি দিচ্ছে—কেন্দ্রে গেলে খুন করে ফেলবে। এই পরিস্থিতিতে ভোটার তো দূরের কথা পোলিং এজেন্ট কেন্দ্রে জেতে পারবে কি না তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ’

সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছি। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় নিজের ভোটের এলাকায় যেতে পারছি না। দলীয় কর্মীরা আমার প্রচারণা চালাচ্ছেন। ’ হুমকি প্রসঙ্গে বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে তাঁরা আদালতের নির্দেশে প্রার্থী হয়েছেন। এর পর তাঁদের এলাকায় দেখা নেই। এমনকি তাঁরা পোস্টারিং পর্যন্ত করেননি। মুলত আমি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী যাতে না হতে পারি সে জন্যই তাঁরা কাগুজে প্রার্থী হয়েছেন। ’

বরগুনার অন্য তিন উপজেলা আগে থেকেই সারা দেশে আলোচিত হয়ে উঠেছে সরকারদলীয় স্থানীয় সংসদ সদ্যসের আচরণে। আচরণবিধি ভঙ্গ করায় ওই সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে খোদ নির্বাচন কমিশন। নেতার বিরুদ্ধে মামলা করলেও থেমে নেই সরকারদলীয় প্রার্থীরা। বিশেষ করে বেতাগী সদরে দল মনোনীত বা বিদ্রোহী—দুজনই প্রায় সমানতালে প্রতিদিনই লোকজন দিয়ে ভয়ভীতি ছড়ানোর মতো মহড়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ অন্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থীর।

পাশের বিবিচিনি ইউনিয়নের বিদায়ী চেয়ারম্যান ও এবারের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আনিসুর রহমান বলেন, ‘এত দিন নানা বাধাবিপত্তি থাকলেও তা পাশ কাটিয়ে প্রচারণা চালিয়েছি। কিন্তু এখন দেখছি নিরাপত্তাজনিত সমস্যা বড় হয়ে উঠেছে। নৌকার প্রার্থীর লোকজন শুধু সাধারণ ভোটারদেরই নয়—আমার এজেন্টদেরও হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, যাতে তারা কেন্দ্রে না যায়। এ ছাড়া এখানে-সেখানে হামলার ঘটনা তো আছেই। ভোটারদের সরাসরি বলা হচ্ছে, চেয়ারম্যানের ভোট ওপেনে নৌকায় দিতে হবে আর বাকিটা গোপনে হবে। ’

বেতাগী সদর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী তারিকুল আলম বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে আওয়ামী লীগের মনোনীত ও বিদ্রোহী—দুই প্রাথীই যাঁর যাঁর মতো করে সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এমনকি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দিনের আলোয় মহড়া দেওয়ার প্রমাণও আছে আমার কাছে। ফলে ভোটাররা রীতিমতো আতঙ্কিত। বিশেষ করে দক্ষিণ বেতাগী, কেওড়াবুনিয়া, ফরাজিবাড়ি, ঝোপখালীসহ আরো কয়েকটি এলাকার ভোটকেন্দ্র নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক খুব বেশি। এ ছাড়া বেতাগী সদর ইউনিয়নের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মজিবর রহমানের বাড়িতে শনিবার রাতে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা হামলা ও ভাঙচুর করেছে। পাশের হোসনাবাদ ইউনিয়নের বিএনপির প্রার্থী বেল্লাল হোসেন রাঢ়ীর খড়ের গাদায় আগুন দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।


মন্তব্য