kalerkantho


ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬ : সরেজমিন প্রতিবেদন

চা বাগানে অন্য রকম আমেজ

পার্থ সারথি দাস ও ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট থেকে   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চা বাগানে অন্য রকম আমেজ

ডানে-বাঁয়ে যত দূরে চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। সবুজের বুকচিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে মেঠোপথ।

পথের ধারে কোথাও সারি সারি মাটির ঘর, কোথাও চায়ের দোকান, কোথাও উপাসনালয়, বিদ্যালয়। বসন্তের কোকিল আর নানা পাখির ডাকে নীরবতা ভেঙে যায়, ছড়িয়ে পড়ে সুর। কিন্তু এখন অন্য রকম আমেজ। প্রকৃতির এসব কোলাহল ছাপিয়ে বাতাসে ভাসে মাইকের আওয়াজ। ভোটের স্লোগান।

গতকাল রবিবার দুপুরে সিলেট শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে খাদিমনগর চা বাগানে পাওয়া গেল সে রকম আমেজ। এটা যে নির্বাচনী আমেজ বুঝতে কষ্ট হয় না। কারণ সদর উপজেলার এই এলাকার দোকানঘর, মাটির ঘর, বিদ্যালয় ও উপাসনালয়ের দেয়ালে, গাছের গায়ে সাঁটানো প্রার্থীদের পোস্টারই বলে দেয় এখন এখানে চলছে নির্বাচনী উৎসব।

সিলেট সদর উপজেলার আটটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আগামীকাল।

এই আটটি ইউনিয়নের খাদিমনগর ও টুকেরবাজার ইউনিয়নেই পড়েছে ১২টি চা বাগান। এর মধ্যে খাদিমনগর ইউনিয়নেই চা বাগান পাঁচটি।

স্থানীয় লোকজন বলছে, চা শ্রমিক প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ও চা শ্রমিক ভোটারদের ঘরে ঘরে সব প্রার্থীর প্রতিযোগিতামূলক আনাগোনায় প্রথমবারের মতো লক্ষণীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে এখানে।

জানা গেছে, খাদিমনগর বরজান কারখানা, ছড়াগাঙ, কালাগুল ও বরজান চা বাগানে সব মিলে ভোটার দুই হাজার ৮০০ জন। এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে খাদিমনগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকেই চা শ্রমিকদের মধ্য থেকে ছয়জন সাধারণ সদস্য ও তিনজন সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রার্থী হয়েছেন।

একটি চায়ের দোকানে আলাপ করছিলেন বরজান কারখানা চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি বিলাস ব্যানার্জি। কালের কণ্ঠকে পরিস্থিতি জানিয়ে বললেন, ‘চা শ্রমিকরা আগের মতো পিছিয়ে নেই। তাঁরা নির্বাচনে প্রার্থীও হচ্ছেন। ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সদস্য পদে প্রার্থী ছয়জনের দুজনই আমার স্বজন। একজন দোলন কর্মকার দুলু আমার কাকা, অন্যজন আমার ভাই সবুজ তাঁতি। ’

বরজান কারখানা চা-বাগানে মেঠোপথ ধরে ঘরে ফিরছিলেন মানসা বাউরি। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘পথম ভুট দিমু—সেন্টার (ভোটকেন্দ্র) কই বলতে পারমু না। ’

খাদিমনগর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন তারা মিয়া। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী ইলিয়াস আলী, চশমা প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মো. দিলোয়ার হোসেন।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, চেয়ারম্যান পদে পাঁচজন দাঁড়ালেও এই তিন প্রার্থীর মধ্যে হবে মূল লড়াই। তবে ধানের শীষের ভোট টানবে চশমা।

খাদিমনগরের পাশেই খাদিমপাড়া ইউনিয়ন। ইউনিয়নটির ইসলামপুর, সুরমাগেট, শাহপরান আবাসিক এলাকা, নীপবন আবাসিক এলাকায় চলছিল প্রার্থীদের তুমুল প্রচার। ইসলামপুর থেকে টুলটিকর ইউনিয়নের আলুরতল, বালুচর, আরামবাগেও প্রার্থীরা গণসংযোগে ছিলেন ব্যস্ত। আরামবাগ থেকে শাহী ঈদগাহ যাওয়ার পথে ডানে মেঠোপথ ধরে গেলেই দলদলি চা বাগান। টিলার ওপর সবুজ বাগানের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে চোখে পড়ল চারদিক ছেয়ে আছে শত শত পোস্টারে।

দলদলি চা বাগানটি টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে। ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে এটি। চা বাগানের ভেতর ঢুকেই চোখে পড়ে দুর্গা মন্দির। সেখানে অবসরপ্রাপ্ত চা শ্রমিক ৬৫ বছর বয়সী সুবল দাস নির্বাচন নিয়ে কথা বলছিলেন। জানালেন, ওয়ার্ডে তিনজন সাধারণ সদস্য পদে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সদস্য পদে প্রার্থী হয়েছেন মনোরঞ্জন দাস ও সন্দ্বীপ নায়েক। বিকেল সোয়া ৪টায় দলদলি চা বাগানের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র পরিদর্শনে যান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সুবেদার শাহ আলমের নেতৃত্বে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ১০ সদস্য। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, টুকেরবাজার ইউনিয়নে ১৪টি কেন্দ্র আছে। এগুলোর অবস্থান ও পরিস্থিতি দেখছেন তিনি।

প্রচারের শেষ দিনে গতকাল টুকেরবাজার ইউনিয়নের লাক্কাতুরা, মালনীছড়া, আলীবাহার, তারাপুর চা বাগানের প্রার্থীদের আনাগোনা আর তৎপরতা ছিল দেখার মতো। প্রচলিত ধারণা, চা শ্রমিকরা বংশপরম্পরায় স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পক্ষেই ভোট দিয়ে থাকে। এ কারণে প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীরা এই শ্রমিকদের ‘মন’ জয় করতে বেশি মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

 


মন্তব্য