kalerkantho


নাগলিঙ্গম

বৃক্ষজুড়ে সৌন্দর্য

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বৃক্ষজুড়ে সৌন্দর্য

শ্রীমঙ্গল চা বাগান ইনস্টিটিউটে নাগলিঙ্গমের কাণ্ডে ঝুলছে ফুল ও ফল। ছবি : কালের কণ্ঠ

আদি নিবাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। তবে সময়ের পরিক্রমায় এটি ছড়িয়েছে পৃথিবীময়। ভারতীয় উপমহাদেশেও আবাস দীর্ঘদিনের, প্রায় তিন হাজার বছর। সে সুবাদে অনেকে এটির আদি নিবাস হিসেবে এ ভূখণ্ডকেও ভেবে থাকে।

কথা হচ্ছিল নাগলিঙ্গম নিয়ে। ব্যতিক্রমী ও নজরকাড়া একটি বৃক্ষ। ফুল, ফল আর পত্র-পল্লবের জন্য দৃষ্টিমনোহর বৃক্ষটি অবশ্য আমাদের দেশের জন্য এখন দুষ্প্রাপ্যই বলা যায়। বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম গাছের সঠিক পরিসংখ্যান সেভাবে জানা না থাকলেও বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, সব মিলিয়ে দেশে এই গাছের সংখ্যা ৫০টির মতো হতে পারে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি, বলধা গার্ডেনে একটি, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় একটি ও মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে একটি নাগলিঙ্গম গাছ থাকার তথ্য অনেকেরই জানা।

দক্ষিণ আমেরিকায় নাগলিঙ্গমের স্থানীয় নাম কুরুপেটা। বৈজ্ঞানিক নাম ঈড়ঁত্ড়ঁঢ়রঃধ মঁরধহবহংরং। এই গাছের বিস্তার ঘটানো সম্ভব হয় না মূলত এই গাছের বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম না হওয়ার কারণে। তবে গুটি কলম করে এর বংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব। আর এ কারণে সারা পৃথিবীতেই গাছটি বিলুপ্তির পথে।

গাছটি যত বড়ই হোক না কেন নিচের অংশে কাণ্ডের মাঝে ফুল ও ফল হয়। ফলের ওজন কয়েক কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফুলের সুবাস পাওয়া যায় বহুদূর থেকেও। তবে এই গাছের ফলের গন্ধ বেশ তীব্র। ফল ভেঙে কারো হাতে লাগলে কয়েক দিন পর্যন্ত সেই গন্ধ স্থায়ী হয়।

ক্যানন বলের মতো ফল ধারণকারী এই বৃক্ষ ৩৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কাণ্ড সরল, উন্নত এবং ওপরের দিকে শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। বাকল বাদামি ধূসর, অমসৃণ। পাতা গুচ্ছাকৃতির এবং আট থেকে ৩১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা। তবে পাতার দৈর্ঘ্য ৫৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাতার রং কালচে সবুজ, তবে অত্যন্ত উজ্জ্বল। গ্রীষ্মকালে এদের পত্র মোচন হয়। গাছটি বহু শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট এবং বড় বড় ডালে ফুলের মঞ্জরি ধরে। কখনো কখনো পুরো গাছের কাণ্ড থেকেই ফুল বের হয়। ফুলগুলো কমলা, উজ্জ্বল লাল ও গোলাপি রঙের, ঊর্ধ্বমুখী, ছয়টি পাপড়িযুক্ত এবং তিন মিটার দীর্ঘ মঞ্জরিতে ফুটে থাকে। ফুল দৈর্ঘ্যে ছয় সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর পাপড়ি গোলাকৃতি, বাঁকানো, মাংসল এবং ভেতর ও বাইরে যথাক্রমে গাঢ় গোলাপি ও পাণ্ডুর হলুদ। গ্রীষ্মকাল ধরেই এই গাছে ফুল ফোটে।

হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গফফার আহমেদের পরিচিতি একজন বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে। জেলার ঐতিহ্যবাহী স্কুলটিতে গেলেই দেখা যাবে বিভিন্ন ধরনের ফুল ও বৃক্ষের সমাহার। স্কুল প্রাঙ্গণের এই বাগানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে একটি নাগলিঙ্গম গাছও আছে।

গফফার আহমেদ জানান, দুর্লভ নাগলিঙ্গম গাছের একটি চারা সংগ্রহের জন্য তিনি নানা স্থানে যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন হবিগঞ্জ রামকৃষ্ণ মিশনে একটি নাগলিঙ্গম গাছ রয়েছে। একদিন তিনি ওই মিশনে যান। মিশনের অধ্যক্ষ শিবাত্মানন্দকে নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি নাগলিঙ্গমের একটি চারার আবদার করেন। এভাবে সেখান থেকেই একটি চারা সংগ্রহ করা হয়। সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দুই বছরে গাছটি অনেকটাই বেড়ে উঠেছে। তবে রামকৃষ্ণ মিশনের ৮০ বছরের পুরনো নাগলিঙ্গম গাছটি মরে যাচ্ছে বলে জানান অধ্যক্ষ শিবাত্মানন্দ। বিকল্প হিসেবে আরো তিনটি চারা লাগানো হয়েছে সেখানে।

হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুভাষ দেব জানান, নাগলিঙ্গমের ফুল উজ্জ্বল গোলাপি, পাপড়িগুলো গোলাকার ও কুণ্ডলী পাকানো। ফুটন্ত ফুলের পরাগকেশর সাপের ফণার মতো। আর এ কারণেই গাছটির নাম নাগলিঙ্গম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। জনশ্রুতি আছে যে নাগলিঙ্গম গাছের ফুল নাগ-নাগিনী পাহারা দেয়। এ কুসংস্কারের কারণে আগে প্রতিবছর নাগ পঞ্চমীতে এই গাছের গোড়ায় পূজা করে নাগকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হতো।

কুসংস্কারের কারণে স্থানীয়রা এই ফুল না ছিঁড়লেও কবিরাজরা তা সংগ্রহ করেন। কারণ দুর্লভ নাগলিঙ্গম গাছের রয়েছে ব্যাপক ঔষধি গুণ। এর ফুলের কলি দিয়ে রস তৈরি করে খাওয়ালে প্রসূতির সন্তান প্রসব সহজ হয়। এর মাঝবয়সী পাতা দিয়ে তৈরি পেস্ট দাঁতের পাইরিয়া রোগ নিরাময়ে ব্যাপক কার্যকর। এই গাছের বাকল দিয়ে বহুমূত্র রোগের ওষুধও তৈরি করা হয়।

নাগলিঙ্গম গাছে কাঠ অত্যন্ত মজবুত। লালচে বাদামি রঙের এই কাঠ রেলের স্লিপারসহ ভারি কাজে লোহার পরিবর্তে ব্যবহার করা যায়।


মন্তব্য