kalerkantho


দরকার নেই তবু মেয়াদ বাড়ানোর পাঁয়তারা

আরিফুজ্জামান তুহিন   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দরকার নেই তবু মেয়াদ বাড়ানোর পাঁয়তারা

বিদ্যুৎ বিপর্যয়কে দ্রুত সামাল দিতে রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট বা ভাড়ায় বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগও রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়। বিতর্ক ওঠায় সরকার বলেছিল, বড় বিদ্যুেকন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলে এ ব্যবস্থা থেকে সরে যাবে তারা।

বর্তমানে বিদ্যুতের স্থাপনাক্ষমতা ১২ হাজার ৭১ মেগাওয়াট। ২০১৮ সালের মধ্যে কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র উৎপাদনে আসবে। তখন লোডশেডিংও বলতে গেলে হবে না। এ বাস্তবতায় রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা আর থাকার কথা নয়। এর পরও এগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে।

রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র বিনা দরপত্রে স্থাপন করা হয়েছিল। ফলে এসবের প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসবের জ্বালানি সরকার বিনা মূল্যে দেয়, অথচ উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেনে চড়া দামে। কেন্দ্রের ভাড়া অর্থাৎ ক্যাপাসিটি চার্জও চড়া। ফলে রেন্টালের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ২৫ টাকা খরচ হয়; অথচ সরকারের বড় একটি কেন্দ্রে প্রতি ইউনিটে খরচ হয় সর্বোচ্চ পাঁচ-ছয় টাকা। রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র করা হয়েছিল তিন বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদে। সরকার এগুলোর মেয়াদ আর বাড়ানোর পক্ষে নয়। কারণ এখন বিদ্যুতের সংকট আগের মতো নেই। সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বিদ্যুৎসচিব মনোয়ার ইসলাম।

জানা গেছে, সরকার নীতিগতভাবে রাজি না থাকার পরও গত বছর রেন্টালের মেয়াদ এক দফায় বাড়িয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই বিভাগের এক কর্মকর্তার অতি উৎসাহে এটা করা হয়েছে। সম্প্রতি তাঁকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগে রেন্টাল কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে কর্মকর্তার অভাব নেই। আছে বলেই ভোলার ভেঞ্চার এনার্জি রিসোর্স লিমিটেডের ৩৩ মেগাওয়াটের কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ্রটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১১ জুলাই।

ভেঞ্চারের এই কেন্দ্র ২০০৮ সালে তিন বছর মেয়াদে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। প্রথম মেয়াদ শেষের পর আরো পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ানো হয়। এখন আবার পাঁচ বছর বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে।

জানা গেছে, ভেঞ্চার এনার্জি রিসোর্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মামুন হায়দার গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সচিবের কাছে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছেন। তাঁদের কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ৩৩ মেগাওয়াট হলেও আবেদনপত্রে ৫৫ মেগাওয়াট দেখানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘রেন্টাল কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেখানোতে অনেক লাভ আছে। উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী কেন্দ্রের ভাড়া দেওয়া হয়। বেশি উৎপাদন ক্ষমতা দেখানো হলে কেন্দ্রের ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জও বেশি দেওয়া হবে। কোনো মাসে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা না হলেও ওই হারেই ভাড়া দেওয়া হবে। ফলে কেন্দ্র মালিকরা ক্যাপাসিটি বেশি দেখাতে চাইবেন। ’

পিডিবি সূত্র জানায়, ভোলায় দুটি বিদ্যুেকন্দ্র রয়েছে। একটি ভেঞ্চার এনার্জি রিসোর্স লিমিটেডের, ৩৩ মেগাওয়াটের। অন্যটি পিডিবির মালিকানাধীন ২২৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্র। ভোলায় ওই রেন্টাল কেন্দ্রের আর প্রয়োজন নেই বলে সংশ্লিষ্টদের মত। কেন্দ্রটি দিনে গড়ে ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জ নেয় ৩৩ মেগাওয়াটের। গ্যাসের সংকট থাকায় গ্যাসভিত্তিক সরকারি বিদ্যুেকন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রাখতে হয়। তাই গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্র চালাতে আগ্রহী নয় পিডিবি। ভেঞ্চারের কেন্দ্রটির মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়লে অযথা কয়েক শ কোটি টাকা খরচ হবে।

ছোট বিদ্যুেকন্দ্রে জ্বালানির খরচ বেশি হয়। পেট্রোবাংলার হিসাবে ভোলার দুটি বিদ্যুেকন্দ্রে দৈনিক ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। ২২৫ মেগাওয়াটের কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুেকন্দ্র চালাতে দৈনিক ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস লাগে। আর ৩৩ মেগাওয়াটের রেন্টাল কেন্দ্রের জন্য লাগে দিনে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সংশ্লিষ্টদের মতে, বেশি জ্বালানি খরচ করে রেন্টাল কেন্দ্র চালু রাখার যৌক্তিকতা নেই।


মন্তব্য