kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


আফগানিস্তানে ব্র্যাকের দুই কর্মকর্তা অপহৃত

পাবনায় স্বজনরা উৎকণ্ঠায়

নিজস্ব প্রতিবেদক ও পাবনা প্রতিনিধি   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আফগানিস্তানে ব্র্যাকের দুই কর্মকর্তা অপহৃত

আফগানিস্তানে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের দুজন কর্মকর্তাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে গেছে বন্দুকধারীরা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ কুন্দুজ থেকে তাঁদের অপহরণ করা হয়। গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত দুজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সে দেশের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী বা অন্য কেউ এই অপহরণের দায় স্বীকার করেনি বলে ঢাকায় ব্র্যাকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অপহরণের শিকার ব্র্যাকের এই দুই কর্মকর্তা হলেন পাবনার সদর উপজেলার দুবলিয়া এলাকার সিরাজুল ইসলাম খান সুমন (৩৮) ও ফরিদপুর উপজেলার হাংড়াগাড়ী গ্রামের শওকত আলী (৫০)। তাঁদের মধ্যে প্রায় দশ বছর ধরে আফগানিস্তানে কর্মরত শওকত ব্র্যাকের প্রধান প্রকৌশলী। প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সিরাজুল সেখানে কর্মরত আছেন চার বছর ধরে।

আফগানিস্তানে ব্র্যাকের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মো. আনোয়ার হোসেনের বরাত দিয়ে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে কুন্দুজ থেকে বাগলান যাওয়ার পথে একদল বন্দুকধারী অস্ত্রের মুখে সিরাজুল ও শওকতকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে স্থানীয় পুলিশ ও ইন্টেরিওর মিনিস্ট্রিকে জানিয়েছি। তারা কিছু স্টেপ নিয়েছে। ওই গাড়ির ড্রাইভার এবং আরো একজন আফগান ছিল—তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ’

তবে এর সঙ্গে তালেবান জঙ্গিরা জড়িত কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে আনোয়ার হোসেন জানান।

ঢাকায় ব্র্যাকের কমিউনিকেশনস লিড রনি মির্জা বিডিনিউজকে বলেন, ‘কুন্দুজে ফিল্ড ভিজিট শেষে ফেরার পথে শওকত ও সিরাজুল অপহৃত হন বলে আমরা খবর পেয়েছি। কাবুল থেকে ব্র্যাকের একটি প্রতিনিধিদল কুন্দুজে যাচ্ছে। তারা বিষয়টি তদারক করবে। ’

দুই কর্মকর্তা অপহরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাকের ঢাকা কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সিনিয়র মিডিয়া ম্যানেজার) মাহবুবুল আলম কবির গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আফগানিস্তানে অপহৃত ব্র্যাকের দুই কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম ও শওকত আলী এখনো উদ্ধার হননি। এমনকি তাঁদের কোনো খোঁজও পাওয়া যায়নি। ইতিমধ্যে তাঁদের অপহরণের বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। তারা খোঁজখবর নিচ্ছে। এ ছাড়া কাবুলে বাংলাদেশের ব্র্যাক অফিস থেকে তাঁদের উদ্ধার করতে সর্বোচ্চ তৎপরতা চলছে। ’

মাহবুবুল আলম বলেন, এখনো পর্যন্ত কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে অপহৃত দুই ব্র্যাক কর্মকর্তার দায় নেওয়া হয়নি। এ কারণে ঘটনায় জঙ্গি সংগঠন নাকি অন্য কোনো দুর্বৃত্তরা জড়িত তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে তাঁদের উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

ব্র্যাকের বাগলান এলাকার রিজিওনাল ম্যানেজার নাজমুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, অপহৃত দুজনকে উদ্ধারের জন্য আফগানিস্তানের প্রশাসনসহ সব মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে মুক্তিপণের বিনিময়ে হলেও তাঁদের উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হবে।

এদিকে অপহৃত সিরাজুল ও শওকতের পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। সিরাজুল পাবনা সদরের দুবলিয়া পুরাতন পাড়ার এজেম উদ্দিন খানের ছেলে। গতকাল তাঁদের বাড়ি গেলে স্থানীয় ফজিলাতুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এজেম উদ্দিন জানান, তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সিরাজুল তৃতীয়। পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে যোগদান করেন। প্রায় ১০ বছরের চাকরি জীবনে গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি আফগানিস্তানে কর্মরত আছেন।

সিরাজুলের চাচাতো ভাই আবদুল খালেক কালের কণ্ঠকে জানান, প্রায় দেড় মাস আগে তাঁর ভাই ২৮ দিনের ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি আফগানিস্তানে কর্মস্থলে চলে যান। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যার দিকে সিরাজুলের সঙ্গে বাড়ির লোকদের শেষ কথা হয়। সে সময় তিনি জানান অফিসের কাজে বাইরে যাচ্ছেন। এই দিনই রাত ৯টার দিকে আফগানিস্তান থেকে ব্র্যাকের বাগলান অঞ্চলের রিজিওনাল ম্যানেজার নাজমুল হোসেন তাঁদের ফোন করে সিরাজুলের অপহরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

সন্তানের অপহরণের কথা শুনে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন সিরাজুলের মা শাহনাজ পারভীন। কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন সিরাজুলের স্ত্রী লতাও। মাত্র দুই বছর আগে সিরাজুলের সঙ্গে লতার বিয়ে হয়।

পাবনা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী লতা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে সিরাজুল তাঁকে ভিডিও কল দেন। এ সময় তিনি গাড়িতে কুন্দুজ থেকে বাগলান যাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, গাড়িতে বেশিক্ষণ বাংলায় কথা বলা সম্ভব না। দুই ঘণ্টা পরে গন্তব্যে পৌঁছে আবারও কথা হবে। দুই ঘণ্টা পরও সিরাজুলের ফোন না পেয়ে তিনি (লতা) নিজেই কল দেন। এ সময় তাঁকে সিরাজুলের অপহরণের কথা জানানো হয়।

সিরাজুলের মা-বাবা, ভাইবোনসহ এলাকার মানুষ দ্রুততম সময়ে সিরাজুলসহ অপহৃত দুই বাংলাদেশিকে উদ্ধারের জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

অপহৃত আরেক বাংলাদেশি পাবনার ফরিদপুর উপজেলার হাংড়াগাড়ী গ্রামের মৃত মোক্তার হোসেনের ছেলে শওকত আলী লাবলুর পরিবারের সবাই দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

শওকত আলীর বড় ভাই বাবলু কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে শওকত দ্বিতীয়। জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখে তিনি প্রায় এক মাসের ছুটিতে দেশে এসে গ্রামের বাড়ি আসেন। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁরা শওকতের অপহরণের সংবাদ পান।

পাবনার জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। অফিশিয়ালি জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

প্রসঙ্গত, ব্র্যাক আফগানিস্তানে কাজ শুরু করে ২০০২ সালে। ২০১২ সালের মে মাসে ঘোর প্রদেশে ব্র্যাকের একটি কার্যালয়ে ঢুকে এক কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ব্র্যাকের এক প্রকৌশলীকে হত্যা করে অপহরণ করা হয় ছয়জনকে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের গুলিতে প্রাণ যায় আরেক ব্র্যাক কর্মকর্তার। ওই বছর নুরুল ইসলাম নামে এক ব্র্যাক কর্মকর্তা অপহৃত হওয়ার ৮৩ দিন পর মুক্তি পান। ২০০৮ সালের অক্টোবরে গজনি প্রদেশ থেকে অপহৃত হন দুজন। ১০ দিন পর তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।


মন্তব্য