kalerkantho


রংপুরের পীরগাছা

সংঘাতের বদলে সংহতি, উৎসবের আমেজে প্রচার

আপেল মাহমুদ ও স্বপন চৌধুরী রংপুর থেকে   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সংঘাতের বদলে সংহতি, উৎসবের আমেজে প্রচার

রংপুর বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বদিকে পীরগাছা উপজেলার একটি ইউনিয়ন কল্যাণী। নামের মতোই অর্থবহ এলাকা। নির্বাচনী হাওয়ার দোলা লেগেছে এখানকার প্রায় ১৭ হাজার ভোটারের প্রাণে। তবে কোনো সহিংসতা নেই, বরং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে চলছে সব দলের প্রচার। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় এ জনপদ জনবিস্ফোরণে উদ্বেলিত হয়েছিল।

যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পীরগাছা মন্থনার জমিদার দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠক। সেই জনপদে আজ চলছে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচার।  

২২ মার্চ প্রথম পর্বের নির্বাচনে রংপুর জেলার একটিমাত্র ইউনিয়নেই ভোটগ্রহণ হবে। প্রায় ১৪ বছর পর এই ইউনিয়নে নির্বাচন হওয়ায় এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটাররা বলছেন লড়াই হবে মূলত তিন প্রার্থীর মধ্যে।

কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত কল্যাণী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর আলম, বিএনপি মনোনীত ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিন, জাতীয় পার্টি মনোনীত ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিল সরকার ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আবু তাহের।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রার্থীদের মধ্যেও কোনো প্রতিহিংসা কিংবা কুৎসা রটনার মানসিকতা নেই। কর্মী-সমর্থকরা একসঙ্গে নিজেদের প্রার্থীদের জন্য ভোট প্রার্থনা করছে। হেঁটে, সাইকেল কিংবা মোটরসাইকেলে করে কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছে। এই শান্তিপূর্ণ অবস্থার জন্য ভোটাররা স্থানীয় সংসদ সদস্য টিপু মুনশী ও উপজেলা চেয়ারম্যান আফছার আলীকে কৃতিত্ব দিতে চান। এ দুজনই এলাকাবাসীকে বলেছেন, ‘ভোটাররা যাঁকে চাইবে তিনিই ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। এখানে সহিংসতা কিংবা ভোট কারচুপি হবে না। ’     

গতকাল শুক্রবার কল্যাণী ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, ইউনিয়নের তালুক কল্যাণী, ছোট কল্যাণী, ফকিরা, তৈয়ব, স্বচাষ, বিহারী, বড় হাজরা, তালুক উপাসু, তালুক কচুয়া, ফতা, আবু হাজরা, হরগোবিন্দ, তালুক পশুয়া, খামার উপাসু এলাকায় উৎসবের আমেজ চলছে। প্রচারের শেষ বেলায় এসে প্রার্থীদের দম ফেলার সময় নেই। কর্মী-সমর্থকরা নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরছে।

কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে মূলত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে প্রার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে কল্যাণীই হবে একটি মডেল। নিজেদের মধ্যে তো নয়ই, বহিরাগত কেউ সহিংসতার ঘটনা ঘটালে সংঘবদ্ধ এলাকাবাসী তা প্রতিহত করবে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থীরই দলীয় প্রভাব নেই উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, ভোটাররা যাঁকে চাইবেন তিনিই হবেন কল্যাণী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

একাধিক ভোটার জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার চলছে। তবে এলাকায় বর্তমানে কৃষিকাজের মৌসুম হওয়ায় আলু তোলা এবং বোরো ধানের চাষ নিয়ে অধিকাংশ মানুষ ব্যস্ত। এ ব্যস্ততার মধ্যেও ইউনিয়নবাসী দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। সবাই কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবে।  

স্বচাষ এলাকার পল্লী চিকিৎসক কর্ণধর বর্ম্মণের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বড় দরগা বাজারে। তিনি জানান, রংপুর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ জটিলতার কারণে ১৪ বছর পর এই ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। সে কারণে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ বিরাজ করছে। ১৭ হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হিন্দু ভোটার আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে রাজনৈতিক বিষয়ের চেয়ে আঞ্চলিকতার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এখানে স্থানীয়, ভাটিয়া (যাদের আদিনিবাস পাবনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও বগুড়া) ও নোয়াখালী (যাদের আদিনিবাস নোয়াখালী অঞ্চলে) গ্রুপ আছে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী স্থানীয় গ্রুপের হলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী নোয়াখালী গ্রুপের। তবে তিন প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেও জানান তিনি।

নব্দীগঞ্জ বাজারে মদন মোহন্তের চায়ের দোকানে কথা হয় কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার শাহ আলম, মোফাজ্জল হোসেন ও আব্দুল জলিল বলেন, ‘ভোটের আর দুই দিন বাকি। এ্যালাও (এখনো) আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির তিন প্রার্থী সমানে সমান। কায় (কে) হইবে বলা মুশকিল। ’ তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হলেও তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। প্রতিদিন প্রচার শেষে নব্দীগঞ্জ বাজারে তিন প্রার্থীই কুশল বিনিময় করেন বলে জানান সেখানকার ভোটাররা। বিএনপি প্রার্থী জিকরুল আমিন বুধবার রাতে প্রচারকালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রংপুর মেডিক্যালে আছেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর কর্মী-সমর্থকরা রাত-দিন মাঠে রয়েছে।  

ছোট কল্যাণী এলাকার আজাদ খান বলেন, ‘এখানে ভোট নিয়ে সহিংসতার আশঙ্কা নেই। বিগত ভোটের সময়ও এ ধরনের নজির চোখে পড়েনি। যার কারণে এলাকাবাসী এ ধরনের ঘটনা ঘটলে নিজেরা ঠেকাবে। ’ নির্বাচনে প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, বিএনপির পীরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান আফছার আলী ও আওয়ামী লীগের এমপি (পীরগাছা-কাউনিয়া) টিপু মুনশী ঘোষণা দিয়েছেন এখানে কোনো বল প্রয়োগ হবে না। ভোটাররা যাঁকে ভোট দেবেন তিনিই নির্বাচিত হবেন। জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল জলিল সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন দলের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করলেও আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে এখানে কোনো সহিংস ঘটনা ঘটেনি। এবারও ঘটবে না। ভোটারের ভোটে যে প্রার্থীই জয়লাভ করুক, তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। ’

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নূর আলম বলেন, ‘কল্যাণী ইউনিয়নে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে। এখানে নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ নেই। কালো টাকা কিংবা সন্ত্রাসীদের কোনো স্থান নেই। এখানে সব দলের প্রার্থী চান সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন হোক। ’

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জিকরুল আমিন বলেন, ‘এই ইউনিয়নে প্রায় ১৪ বছর পর নির্বাচন হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। আশা করি, কল্যাণী ইউনিয়নের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হবে। ’

জেলা নির্বাচন অফিসার জি এম সাহাতাব উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কল্যাণী ইউনিয়নের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ইউনিয়নের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। অতীতের মতো এবারও সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না বলে আমরা আশা করছি। ’

 


মন্তব্য