kalerkantho


বরিশাল সদর

শক্ত অবস্থানে বিএনপি, অশান্তি আওয়ামী লীগে

তৌফিক মারুফ, রফিকুল ইসলাম ও এস এম মঈনুল, বরিশাল থেকে   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শক্ত অবস্থানে বিএনপি, অশান্তি আওয়ামী লীগে

বরিশাল সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে চলছে শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী প্রচারণা। চারদিকে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ।

বিশেষ করে নতুন ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ভোটাররা বলছেন, প্রাথমিক পরিসংখ্যানে এই ১০ ইউনিয়নে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা রয়েছেন কিছুটা বেকায়দায়। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইটা হবে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে। গতকাল শুক্রবার সরেজমিন ঘুরে প্রার্থী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল সকাল থেকে সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলো ঘুরে দেখা যায়, সবখানেই নৌকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাথার ওপর উড়ছে ধানের শীষের পোস্টার। বাবুগঞ্জের মাধবপাশা, রহমতপুর ইউনিয়নে চোখে পড়েছে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার দাপট। তবে প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচারণায় নামতে পারছেন না—বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন বক্তব্য মানতে রাজি নন ভোটাররা। তাঁরা বলছেন, বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদিন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।

শুধু চেয়ারম্যান প্রার্থীরাই নন, বিএনপি সমর্থক মেম্বার প্রার্থীরও প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাও প্রচারণায় সমান সক্রিয়।

সরেজমিনে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চরবাড়িয়া ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী জিয়াউল ইসলাম সাবু, সাস্তেবাদে মামুন-অর-রশীদ ওরফে খোকন মাস্টার, কাশিপুরে মোহাম্মদ হোসেন সিকদার শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এ ছাড়া কড়াপুর, জাগুয়া, চরমোনাই, টুঙ্গিবাড়িয়া, চাঁদপুরা, চন্দ্রমোহন ও চরকাউয়া ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীদের অবস্থান তুলনামূলক ভালো; যদিও কোনো কোনো ইউনিয়নে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। পক্ষান্তরে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তুলনামূলক পিছিয়ে রয়েছেন।  

বরিশালে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রবীণ নেতা বলছেন, কেবল বরিশাল সদর নয়, বিভাগজুড়েই আওয়ামী লীগে রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। কেন্দ্রীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ভিন্ন ভিন্ন মতের কারণে তৃণমূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের একেকজন একেক প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন। আবার স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ইন্ধনে সবখানেই রয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। ফলে সংঘাতের পাশাপাশি দলের ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা যায়, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ৪২টি উপজেলার ৩৫৭টি ইউনিয়নের মধ্যে আগামী ২২ মার্চ প্রথম ধাপে ভোটগ্রহণ হবে ২৭২টিতে। এতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন ১৭৫ জন। অন্যদিকে বিএনপিরও বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন কেবল বরিশাল ও বরগুনায় মোট চারজন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের মধ্যে ঝালকাঠির চারটি উপজেলার ৩১ ইউনিয়নে ৩৫ জন, পটুয়াখালীর ৫০ ইউনিয়নে ৪৪ জন, পিরোজপুরের সাতটি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নে ১২ জন, বরগুনার পাঁচটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নে ২০ জন ও ভোলার সাত উপজেলার ৪৩ ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিতে ৯ জন বিদ্রোহী  প্রার্থী রয়েছেন আওয়ামী লীগে।

এমন পরিস্থিতিতে কেবল বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করেই হাত-পা গুটিয়ে স্বস্তিতে বসে থাকতে পারছেন না আওয়ামী লীগ নেতারা। বরং তাঁরা দিনরাত এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছুটছেন। গতকালও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ,  সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুসসহ জেলা পর্যায়ের নেতারা মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদী গিয়েছিলেন। তাঁরা ওই দুই উপজেলা সদরে গিয়ে মতবিনিময় করেছেন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে।

সাংগঠনিক তৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, ‘যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো তৎপরতা চালাবে তাদেরই বহিষ্কার করা হচ্ছে এবং আরো হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এবার দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হওয়ায় তৃণমূলের অনেক নেতাই মনোনয়ন চাইছেন। কিন্তু সবাইকে তো সুযোগ দেওয়া যায় না। এতে অনেকে সংক্ষুব্ধ হতে পারেন। আমরা সাংগঠনিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ করার। ’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনীত আর বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে ভোটের পরিবেশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী ইউনিয়ন এলাকাগুলোতে মানুষের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগের তৈরি হয়েছে; যদিও পরিস্থিতি উপলব্ধিতে নিয়েই সাংগঠনিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

তবে সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে যে সহিংসতা চলছে সে তুলনায় বরিশাল সদরের চিত্র ভিন্ন। তবে কিছুটা উল্টো পরিস্থিতি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে। এ উপজেলার ভাসানচর ইউনিয়নে সহিংসতায় একজন কর্মী নিহত হয়েছেন। একইভাবে পাশের জেলা পটুয়াখালীর বাউফলে একজন খুন হয়েছে। এসব ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে।

বরিশাল সদরের জাগুয়া ইউনিয়নের হোগলা গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুর রব মল্লিক বলেন, ‘খবরে দেখি বরিশালেই নাকি মারামারি-হানাহানি-খুনাখুনি চলছে। কিন্তু বরিশাল সদর উপজেলার কোনো ইউনিয়নে এমন কিছু দেখছি না। যা হচ্ছে বিভাগের অন্য জেলা ও উপজেলায়। এখানে যে যার মতো ভোট চাইছে। দুই দলই মাঠে আছে। ’

এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক বলেন, ‘আমাদের অবস্থা ভালোই আছে। প্রশাসনের লোকজন আমাদের বেশি সক্রিয় কর্মীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করে। তা আমরা ওভারকাম করেই আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ’

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, ‘কারো কোনো ভয়ভীতির কারণ নেই। ভোটাররা যাকে ভোট দিয়ে জেতাবেন তারাই জিতবে। ’


মন্তব্য