kalerkantho


বাগেরহাট

প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় ক্ষুব্ধ ভোটাররা

নিখিল ভদ্র ও বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী বাগেরহাট থেকে   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় ক্ষুব্ধ ভোটাররা

‘ইলেকশন হলি তো ভালো হতো, যা হোক একজনকে ভোট দিতি পারতাম। এখন তো আর চেয়ারম্যান পদে ভোট দিতি পারব না। মেম্বর পদে ভোট দিতি যাব কি না ভাবছি। ’ ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া ইউনিয়নের দিনমজুর মো. আহম্মেদ আলী (৫৪)। এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ

মনোনীত প্রার্থী শেখ শমসের আলী। ফলে সেখানে নির্বাচনী প্রচার কম। সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রচার চালালেও তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ কম বলে জানান স্থানীয় ভোটার আহম্মেদ আলী।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের ৭৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩২টিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করেছেন। বাগেরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক কালের কণ্ঠকে জানান, এর মধ্যে ১৯টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বাইরে কেউ মনোনয়ন জমা দেয়নি। বাকিগুলোতে জমা দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ ছাড়া রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবুল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হলেও আপিলে বিএনপির মো. রফিকুল ইসলাম প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় সেখানে নির্বাচন হচ্ছে। আর ফকিরহাটের মূলঘর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হলেও আদালতের নির্দেশে সেই নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান নির্বাচন কর্মকর্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দোয়া ও আশীর্বাদ চাইছেন তাঁরা। তাঁদের কর্মী-সমর্থকরা মিছিল ও পথসভায় মুখর করে রেখেছে এলাকা। অন্যদিকে যেসব ইউনিয়নে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী আছে, সেখানেও তাঁদের তেমন একটা জনসংযোগ করতে দেখা যাচ্ছে না। বেশির ভাগ ইউনিয়নে তাঁদের পোস্টার-লিফলেট দেখা যায়নি। স্থানীয় বিএনপির অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা বাধা দেওয়ায় বিরোধী কোনো দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। শুধু তাই নয়, যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁরাও প্রচার চালাতে পারছেন না। তাঁদের নির্বাচনী অফিস, এমনকি বাড়িতে হামলা করা হচ্ছে। অনেকেই ভয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম অভিযোগ করেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দুই দিন আগে থেকেই আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা বিএনপির প্রার্থীদের নানাভাবে হুমকি দিয়েছে। এতে দলীয় প্রার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এমনকি বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর, গোটাপাড়া ও কচুয়া উপজেলার গজালিয়া থেকে তাদের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ছিনতাই হয়ে যায়। এ কারণে ২৭টি ইউনিয়নে তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেননি। আর এখন প্রচার চালাতে পারছেন না। বিএনপির প্রার্থী ও কর্মীরা প্রতিনিয়ত হামলা-মামলার শিকার হচ্ছে।

তবে এই অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন বাগেরহাট সদর আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর শওকাত আলী বাদশা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার শিল্পপতি সালাম সাহেব তো নিজেই এলাকায় থাকেন না। এলাকার খোঁজখবর রাখেন না। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁদের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে। তাঁরা প্রার্থী দেবেন কিভাবে?’ তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির কারণে জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। আর জনবিচ্ছিন্ন এই দলের প্রার্থী হলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে—এ কারণে অনেক ইউনিয়নে তারা প্রার্থী খুঁজে পায়নি। ’

নির্বাচনে বাগেরহাটবাসীর নজর জেলার প্রাণকেন্দ্রের ঐতিহ্যবাহী ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের দিকে। সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র এই ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চুকে প্রচার চালাতে দেখা গেলেও বিএনপির প্রার্থী ফকির তৌহিদুল ইসলামের দেখা মেলেনি। তিনি টেলিফোনে জানান, সরকারি দলের হুমকির কারণে তিনি প্রচার চালাতে পারছেন না। তবে সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারলে তাঁকেই ভোট দেবেন। ষাটগম্বুজ মসজিদের সামনে কথা হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর সঙ্গে। জনগণ আবারও তাঁকে নির্বাচিত করবে দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী তো একাধিক মামলার আসামি। সে প্রচারণা চালাবে কিভাবে? আর বিএনপির কর্মী-সমর্থক নেই। বর্তমান সরকারের উন্নয়নে সাধারণ ভোটাররা এখন নৌকার পক্ষে। তাই বিএনপি অপপ্রচারে লিপ্ত। ’

শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নেও একক প্রচার চালাচ্ছেন নৌকা মার্কার প্রার্থী আসাদুজ্জামান মিলন। বর্তমান চেয়ারম্যান মিলন আবারও নির্বাচিত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। তবে তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন মানিকও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, বাগেরহাটেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। মোরেলগঞ্জ উপজেলার জিউধরা ইউনিয়নে পাঁচবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান দলীয় মনোনয়ন পাননি। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নৌকা মার্কার প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বাদশা তাঁকে হুমকি দিচ্ছেন। তার প্রচারে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় তাঁর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার বেশির ভাগ ইউনিয়নে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা দাপিয়ে বেড়ালেও কোথাও কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। মংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহ আলম নৌকা মার্কার প্রার্থী ও কর্মীদের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের মোল্লা মো. তারিকুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জেলার আটটি ইউনিয়নে জামায়াতের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিলেও কেউ সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।

বাগেরহাটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতরা হলেন সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে অ্যাডভোকেট শংকর কুমার চক্রবর্তী, খানপুরে ফকির ফাইম উদ্দিন, গোটাপাড়ায় শেখ শমসের আলী, রাখালগাছিতে শেখ আবু শামিম আসনু, বাড়ইপাড়ায় মো. সরোয়ার হোসেন, যাত্রাপুরে এম এ মতিন, ডেমায় মো. মনি মল্লিক, বেমরতায় মনোয়ার হোসেন টগর, কাড়াপাড়ায় শেখ বশিরুল ইসলাম, কচুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নে শিকদার হাদিউজ্জামান, বাঁধালে নকিব ফয়সাল ওহিদ, গজালিয়ায় এস এম নাসির উদ্দিন, মোরেলগঞ্জের পঞ্চকরণে রাজ্জাক মজুমদার, তেলিগাথীতে মোরশেদা আক্তার, চিংড়িখালীতে আলী আক্কাস, রামপালের মল্লিকেরবেড় ইউনিয়নে তালুকদার নাজমুল কবির ঝিলাম, মংলার সোনাইলতলা ইউনিয়নে নাজিনা বেগম, চিতলমারী সদর ইউনিয়নে মো. নিজাম উদ্দিন, বড়বাড়িয়ায় মাসুদ সরদার, কলাতলায় মতিয়ার রহমান শিকদার, হিজলায় আজমীর কাজী, শিবপুরে ওহিদুজ্জামান, চরবানিয়ারিতে অশোক কুমার বড়াল, সন্তোষপুরে বিউটি আক্তার, মোল্লাহাটের আটজুড়ি ইউনিয়নে মো. মশিউর রহমান, কোদালিয়ায় ডি এস এম বি সাইফুল, চুনখোলায় মুন্সি তানজিল হোসেন, গাওলায় শেখ রেজাউল কবির, কুলিয়ায় বাবলু মোল্যা, উদয়পুরে এস কে হায়দার মামুন এবং ফকিরহাট সদর ইউনিয়নে শিরিনা আক্তার কিসলু।

খুলনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে গুলি : জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সুরখালি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমান সাগরকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার পার্সেমারি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিনি রক্ষা পেলেও জাহাঙ্গীর হোসেন নামে তাঁর এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বটিয়াঘাটা থানার ওসি মামুন-অর-রশীদ জানান, নির্বাচনী প্রচার শেষে সাগর তাঁর কর্মীদের নিয়ে পারসেমারি এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় কে বা কারা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে। সাগরের শরীরে গুলি না লাগলেও তাঁর কর্মী জাহাঙ্গীরের হাতে গুলি লেগেছে বলে শুনেছেন তিনি।


মন্তব্য