kalerkantho


সিলেট সদর

আ. লীগে বিদ্রোহের সুবিধা পেতে চায় বিএনপি

পার্থ সারথি দাস ও ইয়াহইয়া ফজল সিলেট থেকে   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আ. লীগে বিদ্রোহের সুবিধা পেতে চায় বিএনপি

সিলেট মহানগরীর শাহী ঈদগাহ থেকে পূর্বদিকে যেতে হাতের ডানের এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত। সেনপাড়া কিংবা খরাদিপাড়া কোলাহলহীন। ব্যতিক্রম বাঁ পাশের এলাকা। আরামবাগ, বালুচর কিংবা আলুরতলের মতো শান্ত এলাকাগুলো ‘উত্তাপ’ ছড়াচ্ছে। মাথার ওপর সারি সারি পোস্টার ঝুলছে। উচ্চ শব্দ ভেসে আসছে মাইকে। চলছে লিফলেট হাতে প্রার্থীদের গণসংযোগ। বালুচরের ইজাজ মিয়ার কলোনির বাসিন্দা লাইলী বেগম হনহন করে বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। ফরিদপুর থেকে এসে বালুচরে থিতু হয়েছেন। দীর্ঘ ৩৭ বছরে সিলেটের ভাষা শিখে গেছেন। নির্বাচনের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বালুচরে প্রথম যখন ইলেকশন হইছলো তখনো ভোট দিছিলাম। অত বছরের মইধ্যে ই-বার একটু অন্য রকম ভোট অইব। দেখরা নায়নি সব গরম অই গেছে। ’

সিলেট সদর উপজেলার আটটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে আগামী ২২ মার্চ। এর একটি টুলটিকর ইউনিয়ন। এর ওয়ার্ড ৯টি। ভোটার ১৩ হাজার ৩০০। চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন চারজন প্রার্থী। আর সদস্য পদে প্রার্থী ৪৪ জন। চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল মোছাব্বির। তাঁর প্রতীক নৌকা। আনারস প্রতীক নিয়ে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম আলী হোসেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে বিএনপির প্রার্থী কাজী মুহিবুর রহমান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর ওপর রাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন লুত্ফুর রহমান।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে বালুচর নতুন বাজারের পাশে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল মোছাব্বিরের নির্বাচনী কার্যালয়ে গেলে দেখা যায়, ১০-১২ জন কর্মী বসে আছে। সিএনজিচালিত দুটি অটোরিকশা নিয়ে মাইকিং করতে বেরিয়ে গেছে কয়েকজন। মোছাব্বির তখন বাসা থেকে গণসংযোগে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কার্যালয় থেকে গান ভেসে আসাছিল—আমরা টুলটিকরের সবাই মুছাব্বিরকে চাই...।

আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম আলী হোসেনের নির্বাচনী কার্যালয়ও পাশেই। মন্টু নামের একজন কর্মীকে কার্যালয়ে পাওয়া গেল। আলী হোসেন তখন আরামবাগে গণসংযোগে ব্যস্ত। তবে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর বালুচর নতুন বাজার কার্যালয় ছিল বন্ধ।

স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ মিলল, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে এখানে স্বজনপ্রীতি হয়েছে। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপু মনোনয়ন চেয়েছিলেন চেয়ারম্যান পদে। নিয়ম অনুসারে, ৯টি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক এই তিনটি পদের ২৭ জনের মধ্যে ১২ জনের ভোট পেয়েছিলেন নিপু। মোছাব্বির পেয়েছিলেন তিনটি ভোট। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিপুকে বাদ দিয়ে মোছাব্বিরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মনোনয়ন না পেয়ে নিপু নীরবতা পালন করছেন। তবে বিদ্রোহী আলী হোসেনের পক্ষে তাঁর সব সমর্থন যাবে বলে স্থানীয়রা মনে করছে। এ ব্যাপারে মোচ্ছাব্বির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দল যোগ্য মনে করেই আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। যে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সে তো দলের পক্ষে কাজ করতে পারে না। ’

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী মুহিবুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী আলী হোসেন ও লুত্ফুর রহমানকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। আমি গণসংযোগে ব্যস্ত আছি। ’

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে টুলটিকরসহ আটটি ইউনিয়নের চারটিতেই আওয়ামী লীগ বিদ্রোহের মধ্যে পড়েছে। বিদ্রোহীরা বলছেন, তৃণমূলের মতামতকে অগ্রাহ্য করে প্রার্থী দেওয়ায় তাঁরা মাঠ ছাড়ছেন না। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের জন্য কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগের ৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে আছেন। সিলেট, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটে আওয়ামী লীগের ১৩ জন বিদ্রোহী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে সিলেট সদর উপজেলার টুলটিকর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলী হোসেন, জালালাবাদ ইউনিয়নে মনফর আলী, খাদিমপাড়া ইউনিয়নে অ্যাডভোকেট আফসর আহমদ, মোগলগাঁও ইউনিয়নে শামছুল ইসলাম টুনকে গত বুধবার দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এদিকে গোয়াইনঘাট উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীরা হলেন—রুস্তমপুর ইউনিয়নে আবদুল মতিন, পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে লুত্ফুর রহমান লেবু ও আলীরগাঁও ইউনিয়নে আবুল কাশেম মো. আনোয়ার শাহাদত।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের ছয়জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তাঁরা হলেন—পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে গেদা মিয়া, পূর্ব ইসলামপুরে ইলিয়াছুর রহমান, তেলিখালে আবদুল হক ও কাজী আবদুল ওয়াদুদ আলফু, উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে ফরিদ উদ্দিন এবং দক্ষিণ রনিখাইয়ে এম. হান্নান।

কেন্দ্রীয় সম্মেলনের কারণে বিএনপির বড় নেতারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের প্রচারে অংশ নিতে পারছেন না। বলতে গেলে ব্যক্তিগত শক্তির জোরে তাঁরা চালাচ্ছেন প্রচারণা। আর অধিকাংশ ইউনিয়নেই তাঁরা আওয়ামী লীগে বিদ্রোহের সুযোগ নিতে চান।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত এই নির্বাচনের প্রচারণায় নেই। তবে তাঁর ভাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আবদুল মোমেন গত বৃহস্পতিবার রাতে মোগলগাঁও ইউনিয়নের গোলাম শাহ বাজারসংলগ্ন পথসভায় বক্তব্য দেন। তিনি সেখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগে বিদ্রোহ দমন করতে হচ্ছে। আমাদের দলে এই বিদ্রোহ নেই। তবে সরকারি দলের নেতাদের আচরণ ও চাপে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। টুকের বাজার ইউনিয়নসহ সব কটিতেই আমাদের প্রার্থীরা যথেষ্ট যোগ্য। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বেশির ভাগ ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা জয়ী হবেন।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরীর প্রত্যাশা, এখানে বেশির ভাগ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয় ঘরে তুলবেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সদরের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটে বিদ্রোহীদের তালিকা করা হয়েছে। তাঁদের জেলা কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হবে। বিদ্রোহীদের সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য