kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


নিবন্ধন পরিদপ্তর

টিসি কর্মচারীদের পেনশনের ব্যবস্থা হলো না ৫০ বছরেও

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুধীন্দ্র চন্দ্র বর্মণ অবসরে যান ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর। নিবন্ধন পরিদপ্তরের অধীনে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ট্যাক্স কালেকটিং (টিসি) শাখায় নকলনবিশ হিসেবে চাকরি শুরু করেন তিনি, পরে সহকারী মোহরার হন (প্রথমে অস্থায়ী, পরে স্থায়ী)। স্থায়ী পদ থেকেই অবসরে যান তিনি।

দুঃখজনক বিষয় হলো, তিনি পেনশন-গ্র্যাচুইটি কিছুই পাননি। টিসি শাখার অস্থায়ী কর্মচারীদের এসব দেওয়ার বিধান ছিল না আগে। অস্থায়ী কর্মকাল স্থায়ী কর্মকালের সঙ্গে যোগ না হওয়ায় সুধীন্দ্র বর্মণ পেনশন পাননি।

স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর কর আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় টিসি শাখা খোলা হয়। টিসি সহকারী মোহরার, টিসি সহকারী-কাম-মুদ্রাক্ষরিক প্রভৃতি পদে ৫৪৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তখন থেকে তাদের বেতন-ভাতা নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের (আইজিআর) তহবিল থেকে দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, গত ৫০ বছর ধরে টিসি শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে আইজিআরের বিশেষ তহবিল থেকে। সম্পত্তি হস্তান্তর কর থেকে কমিশন হিসেবে কেটে রাখা টাকায় তহবিলটি গড়া হয়েছিল। অনেক কর্মকর্তা এ তহবিল থেকে ভাতা পান।

সূত্র আরো জানায়, টিসি শাখার সব কর্মচারীর চাকরি সরকারীকরণ (স্থায়ী) করা হয়নি আজ পর্যন্ত। এ কারণে তাদের পেনশন-বঞ্চনা প্রভৃতি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

আইজিআর অফিস সূত্র জানায়, সারা দেশে টিসি শাখায় সহকারী মোহরার পদে ৪৭৬ জন, দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে একই পদে আরো ১৬ জন, জেলা পর্যায়ে টিসি সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে ৬১ জন ও ঢাকা অফিসে ১১ জন—মোট ৫৬৪ জন কর্মরত রয়েছেন। গত ২০ বছরে ১০০ জনেরও বেশি কর্মচারী অবসরে গেছেন। তাঁদের কেউই পেনশন পাননি।

আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ মো. জহিরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, টিসি কর্মচারীরা পেনশন পান না এটা ঠিক। এ নিয়ে আইজিআরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তাঁদের পেনশন দেওয়ার ব্যাপারে কাজ চলছে। বিস্তারিত জানার জন্য তিনি এ প্রতিবেদককে আইজিআরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

এরপর নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজিআর) খান মো. আব্দুল মান্নানের বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। তাঁর সরকারি ফোন নম্বরে কল করা হলে ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) আজমল আলম খান জানান, ‘স্যার মিটিংয়ে আছেন। ’

টিসি শাখার বঞ্চিত কর্মচারীরা জানান, ১৯৬৬ সাল থেকেই টিসি শাখার কর্মচারীরা সহকারী মোহরার পদে নিযুক্ত হয়ে এসেছেন। ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের জন্য স্থায়ী সহকারী মোহরার পদ সৃষ্টি করে। ১৯৬৬ সালের আগে নকলনবিশদের সরকারি মোহরার হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হতো। এরশাদ সরকার সহকারী মোহরার (স্থায়ী) পদে নকলনবিশদের মধ্য থেকে সরাসরি পদোন্নতি দেওয়ার আদেশ দেওয়ায় অস্থায়ী সহকারী মোহরারদের স্থায়ী হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

ওই আদেশের বিরুদ্ধে বঞ্চিত টিসি সহকারী মোহরারদের পক্ষ থেকে ১৯৯০ সালে হাইকোর্টে রিট করা হয়। ১৯৯২ সালে নূরুল ইসলামসহ টিসি শাখার কয়েকজন কর্মচারীর আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেন। নির্দেশনার আলোকে ১৯৯৭ সালের ২ জানুয়ারি মহাপরিদর্শক নিবন্ধন মো. হাবিবুর রহমান একটি পরিপত্র জারি করেন।

পরিপত্রে অস্থায়ী ও স্থায়ী টিসি কর্মচারীদের একীভূত জ্যেষ্ঠতার তালিকা থেকে পদোন্নতি (কার্যত আপগ্রেডেশন) দেওয়ার কথা বলা হয়। মহাপরিদর্শক উল্লেখ করেন, টিসি কর্মচারীদের সরকারীকরণ (স্থায়ী) করতে হলে সরকারের অনুমোদন লাগবে।

মহাপরিদর্শক এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংস্থাপন (বর্তমানে জনপ্রশাসন) মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব; মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রককে চিঠি দেন।

সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এরপর টিসি কর্মচারীদের সরকারীকরণ (স্থায়ীকরণ) নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি।

টিসি শাখার কর্মচারীরা জানান, পরিপত্র জারির পর থেকে তাঁরা পদোন্নতি (কার্যত আপগ্রেডেশন) পাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের চাকরির সরকারীকরণ (স্থায়ীকরণ) হচ্ছে না।

বিভিন্ন অফিসে কর্মরত কয়েকজন টিসি কর্মচারীর নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, আইজিআর অফিসের কিছু কর্মকর্তার অনাগ্রহের কারণে তাঁদের চাকরি স্থায়ী হচ্ছে না। ওই কর্মকর্তারা বিশেষ তহবিল থেকে অন্যায় সুবিধা নিচ্ছেন। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তাঁরা কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখছেন।

বঞ্চিত টিসি কর্মচারীদের পক্ষে ২০০৮ সালে আব্দুর রহমান এবং আরো কয়েকজন হাইকোর্টে আরেকটি রিট আবেদন করেন। বিচারপতি মো. মিফতাহউদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকের ডিভিশন বেঞ্চ শুনানির পর আদেশে বলেন, টিসি শাখার কর্মচারীরা সহকারী মোহরার পদে নিয়োগের দিন থেকেই সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য হবেন। সেভাবেই তাঁদের বেতন-ভাতা ও পেনশন সুবিধা দিতে হবে।

ঢাকা অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন আগামী অক্টোবরে অবসরে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার বেসরকারি কর্মচারীদেরও পেনশন দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু আমরা সরকারি চাকরিতে সারাজীবন খেটেও পেনশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আমাদের মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পেনশনের জন্য জমা রাখা হচ্ছে। এরপরও আমাদের সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণ কেন?’

মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘আমাদের ফান্ড (আইজিআরের বিশেষ তহবিল) থেকেই তো পেনশন দেওয়া সম্ভব। এ জন্য রাজস্ব খাত থেকে এক টাকাও খরচ করতে হবে না। ’

সুধীন্দ্র চন্দ্র বর্মণ জানান, ১৯৭২ সালে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে টিসি নকলনবিশ হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৯ সালের ১৬ আগস্ট সহকারী মোহরার (অস্থায়ী) হন। ২০০২ সালের ১ জুলাই সহকারী মোহরার (স্থায়ী) হন। কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার পঞ্চবটী এলাকার এই বাসিন্দা অবসরে যান ২০০৯ সালে। ২০১৪ সালে তিনি বাধ্য হয়ে আইজিআরের কাছে পেনশনের আবেদন করেন। দেড় বছর পার হয়ে গেল, এখনো তাঁকে পেনশন দেওয়া হচ্ছে না।

সুধীন্দ্র বর্মণ জানান, পেনশন না পাওয়ায় তিনি পরিবার নিয়ে বিপদে পড়েছেন। কষ্টে দিন পার হচ্ছে তাঁর। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার টাকাও হাতে নেই। তিনি বলেন, ‘সরকার তো বয়স্ক ভাতাও দেয়। ৩৭ বছর চাকরি করার পরও ন্যায্য পাওনা পেলাম না। ’

কিশোরগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার আবুল কালাম শেখ বলেন, ‘সারাজীবন চাকরি করে টিসি কর্মচারীরা পেনশন ছাড়াই অবসরে যান। এটা খুবই অমানবিক। তাঁদের পেনশন দেওয়া উচিত। ’


মন্তব্য