kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


অসংক্রামক রোগে সর্বনাশ

তৌফিক মারুফ   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অসংক্রামক রোগে সর্বনাশ

দেশে এমন পরিবার পাওয়া কঠিন যেখানে কারো না কারো ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারের মতো রোগ কিংবা কিডনি অথবা লিভারের সমস্যা নেই। অনেক পরিবারে এমন একাধিক রোগেও আক্রান্ত আছেন কেউ কেউ, যার সব কটিই অসংক্রামক। এই অসংক্রামক রোগ দেশে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এমন উদ্বেগজনক বিবরণ দিয়েছেন। পরিসংখ্যানেও মিলছে এর প্রমাণ। দেশে বছরে যে সাড়ে আট লাখের মতো মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে ৬২ শতাংশই মারা যায় এসব অসংক্রামক রোগে। আর যাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁরাও কেবল নিজের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাই হারান না, এর সঙ্গে হারিয়ে ফেলেন দেশের আর্থ-সামাজিক খাতে নিজের কার্যকর অংশগ্রহণের ক্ষমতাও। উল্টো তাঁরা দেশ, সমাজ ও পরিবারের জন্য এক রকম বোঝা হয়ে দাঁড়ান।

সংক্রামক রোগ সাধারণত মহামারিতে রূপ নেয় বলে এক সময় এটি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ত অনেক দেশের পক্ষেই। ফলে একপর্যায়ে বৈশ্বিক উদ্যোগ নেওয়া হয় মহামারি ঠেকাতে। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েই অনেকটা দিশাহারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। কারণ এক রোগ নিয়ন্ত্রণে আসতে না আসতেই বেড়ে যায় আরেক রোগ। সেই সঙ্গে যোগ হয় এসব রোগের নিত্যনতুন কারণ। দেখা দেয় নতুন গতিপ্রকৃতি। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা, উপযুক্ত জনবল ও যন্ত্রপাতি না থাকায় এসব রোগে আক্রান্ত মানুষ একদিকে যেমন হয়রানির শিকার হয়, অন্যদিকে রোগের গভীরতাও বেড়ে যায়। ফলে একটি পরিবারে একজন কোনো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলেও বিপর্যয়ের শিকার হয় গোটা পরিবার। সব দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হয় স্বজনদের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অসংক্রামক ব্যাধিজনিত মৃত্যুতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি সাধারণ মৃত্যুর ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের অর্জিত শিক্ষাগত ও পেশাদারি দক্ষতা সমাজ ও পরিবারের কাজে লাগানোর আগেই মারা যান।

জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা লেনিন কালের কণ্ঠকে বলেন, অসংক্রামক রোগের মধ্যে বাংলাদেশে কিডনি রোগের প্রকোপ ভয়াবহ দিকে যাচ্ছে। এ রোগে কেউ আক্রান্ত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে তা ধরা না গেলে চিকিৎসার পেছনে সব সহায় সম্বল শেষ করেও কাজ হয় না। বরং রোগীরই কেবল মৃত্য হয় না, ওই পরিবারটিকে চিরদিনের জন্য পথে বসতে হয়। অন্যদিকে বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের আয় রোজগারের সক্ষমতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা অন্য স্বজনদেরও আর্থ-সামাজিক, শারীরিক ক্ষতি হয়। প্রচুর সময় নষ্ট হয় রোগীর পেছনে, যা ওই স্বজনদের কর্মঘণ্টা থেকে কাটা যায়।

কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, গ্রাম পর্যায়ের প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারগুলোতে কিডনি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ জটিল রোগের স্ক্রিনিং ও পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করতে পারলে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

দেশে ক্যান্সারের প্রকোপ দ্রুত বাড়লেও সেই হারে বাড়ছে না এ রোগের চিকিৎসা সুবিধা। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশে বছরে ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় নিয়ে আসা গেলেও এর বাইরে থেকে যায় আরো প্রায় আড়াই লাখ রোগী। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা নিরূপণে কোনো জরিপ বা রেজিস্ট্রেশন না হলেও আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ বলে ধারণা করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যে হারে ক্যান্সার রোগের প্রকোপ বাড়ছে তা সামাল দেওয়া অনেকটাই কঠিন। এ ক্ষেত্রে সবার আগে সবাইকে সচেতন হওয়া দরকার, যাতে করে ক্যান্সারে আক্রান্ত না হতে হয়। এ জন্য তামাক সেবন থেকে শুরু করে যেসব কারণে ক্যান্সার হয় সেগুলো পরিহার করা জরুরি।

হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের তুলনায় বাংলাদেশিরা সাধারণত ১০ বছর আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। আর্সেনিক, কপার ও সিসার মতো বিষাক্ত হেভি মেটাল বাংলাদেশিদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ রিস্ক অব অ্যাকিউট ভাসকুলার ইভেন্টস বা ‘ব্রেভ’ নামের ওই গবেষণা চালায় লন্ডনের ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেস (এনআইসিভিডি)। ওই গবেষণা মতে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে  তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে হৃদরোগীর সংখ্যা বেশি।

অন্যদিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে মহামারি শব্দটি বেশি প্রযোজ্য হলেও এখন বিস্তৃতি অনুসারে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগসহ অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রেও মহামারি শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেদিক থেকে বাংলাদেশে এখন নিশ্চিতভাবে উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগের মহামারি চলছে। এ ক্ষেত্রে আরো কার্যকর উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়মিত ব্যায়াম করা, লবণ, চিনি এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত, ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত খাবার পরিহার করা, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনপ্রণালী মেনে চলা, ওজন ও স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা এবং এসব কারণে মৃত্যু কমানো সম্ভব হয়।

এ ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার প্রবণতাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন, তেমনি শিশুদের দিকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে নজর রাখা উচিত। কারণ, এখন বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও সব ধরনের অসংক্রামক রোগের প্রকোপ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের আরেক বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে তামাকজাত পণ্য। বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের জন্যই এটাকে প্রধানত দায়ী করা হয়। সেই সঙ্গে হৃদরোগেও তামাকের প্রভাব বেশি। এ ছাড়া নতুন এক গবেষণায় বাংলাদেশে তামাকে নিকোটিন ছাড়া আরো ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের অস্তিত্ব মিলেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিক্যুলার বায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আফজাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তামাকজাত পণ্যে কার্বন মনোক্সাইড, নিকোটিন, আলকাতরা, ইরিট্যান্টস ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাসের উপাদান থাকে এটা আগেই জানা, যা থেকে মানুষের দেহে ক্যান্সারসহ আরো কিছু রোগের উদ্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশের তামাকে এর আগে কখনো সিসা, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী পদার্থের খোঁজ পাওয়া যায়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, আগের তুলনায় আরো বেশি ভয়ানক হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশের তামাকপণ্য। ’

ওই বিজ্ঞানী জানান, অন্যান্য ফসলের চেয়ে তামাকে অনেক বেশিমাত্রায় রাসায়নিক-কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। আর তামাকগাছ তুলনামূলকভাবে অন্য ফসলের চেয়ে দ্রুত ও বেশি মাত্রায় মাটি থেকে নানা উপাদান গ্রহণ করে। আবার স্প্রের মাধ্যমে এসব ভারী ধাতুযুক্ত কীটনাশক দেওয়া হয়। ফলে তামাক পাতায় অন্যগুলোর চেয়ে ক্ষতিকর ভারী ধাতু জমেও বেশি, যা আগুনের তাপেও নষ্ট হয় না।

এ ছাড়া নানা ফল, ফসল ও খাদ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের ফলে তা মানবদেহে অসংক্রামক রোগের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ফল-ফসলে নিয়মনীতি না মেনে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ থেকেও কিডনি ও লিভারের ক্ষতির পাশাপাশি ক্যান্সার ও হৃদরোগের সৃষ্টি হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ও অসংক্রামক রোগ কর্মসূচির প্রধান ড. আলিয়া নাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংক্রামক রোগের কারণে আমাদের অনেক অগ্রগতি পিছিয়ে যাচ্ছে। অনেকটা রুগ্ণ জাতির মতো অবস্থার দিতে যাচ্ছি আমরা। তাই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সম্মিলিত ব্যবস্থাপনা ধরে কাজ করা। ’

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মাধ্যমে এসব রোগজনিত অকালমৃত্যুর হার ২০৩০ সাল নাগাদ এক-তৃতীয়াংশ কমানো নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অসংক্রামক ব্যাধি বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষিত করা, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, এসব রোগের ওষুধের জোগান বাড়ানো, রোগীদের রেকর্ড সংরক্ষণ, কার্যকর রেফারাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রয়োজনীয় ফলোআপের জন্য চিকিৎসা কার্ড ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে অসংক্রামক ব্যাধি বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রাথমিক স্তরের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে আরো বেশি গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।


মন্তব্য