kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


লিজ পেতে ট্রাস্টি জমি খাস খতিয়ানে তোলা হয়েছিল!

আপেল মাহমুদ   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লিজ পেতে ট্রাস্টি জমি খাস খতিয়ানে তোলা হয়েছিল!

পুরান ঢাকার কাপ্তানবাজারে রাধাগোবিন্দ পাল ট্রাস্টের প্রায় ১.৫১৩০ একর সম্পত্তি কারসাজি করে সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত করা হয়েছিল। ট্রাস্টের ওই জমিতে ছিল ‘রাধাগোবিন্দ ডিসপেন্সারি’ নামের একটি দাতব্য হাসপাতাল। অনেক আগে থেকেই সম্পত্তিটি দখল করে রেখেছিল একটি চক্র। তারাই একপর্যায়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজনকে প্রভাবিত করে ওই সম্পত্তি খাস খতিয়ানভুক্ত করিয়েছিল পরবর্তী সময়ে কম টাকায় লিজ বা ইজারা নেওয়ার আশায়। দখলদারচক্রটি কয়েকবার সে চেষ্টাও করে। তবে সফল হয়নি। অবশেষে গত ১ মার্চ ওই জমি খাস খতিয়ান থেকে অবমুক্ত করে রায় দিয়েছেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এর ফলে জনহিতকর প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে।

এলাকার বেশ কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নওয়াবপুর, বনগ্রাম, কাপ্তানবাজার, গুলিস্তান, ওয়ারী, টিকাটুলী, দয়াগঞ্জ ও সূত্রাপুর এলাকায় একসময় নিম্ন আয়ের কুলি-মজুর, মুচি, সুইপার, শ্রমিকসহ সাধারণ গরিব মানুষের বসবাস ছিল। কলেরা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, প্লেগ, যক্ষ্মাসহ আরো অনেক সংক্রামক রোগে বিনা চিকিৎসায় তাদের অনেকেই মারা যেত। ওই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিনা পয়সায় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যেই স্থানীয় প্রজাহিতৈষী জমিদার জগমোহন পাল ১৯২০ সালে তাঁর ভাই রাধাগোবিন্দ পালের নামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ জমিদারি এস্টেট থেকেই তিনি হাসপাতালের ব্যয় নির্বাহ করতেন। জমিদারের মৃত্যুর পর হাসপাতালটি যাতে বন্ধ হয়ে না যায় সে জন্য তিনি একটি স্থায়ী ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে যান। এমনকি ট্রাস্টের ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি দাতব্য চিকিৎসালয়ের পাশে .৫১৩০ একর জমি দান করে দেন। ১৯২০ সালের ৭-১-৩২ নম্বর প্রবেট দলিলের মাধ্যমে জমিটি রেজিস্ট্রি করা হয়। তখন থেকে প্রবেট দলিলটি ট্রাস্ট দলিল হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।

ওই বাসিন্দারা জানান, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ট্রাস্টের তৎকালীন রিসিভার শিশির কুমার সেন ভারতে চলে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। এরপর ট্রাস্টের রিসিভার হন অ্যাডভোকেট এ এন এম ইউসুফ। মূলত তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়ই ট্রাস্টের বিশাল সম্পত্তি হাতছাড়া হতে থাকে। হাসপাতালের সম্পত্তির ওপর হোটেল, পলিথিন কারখানা, আটা-ময়দার কল, কাঁচাবাজারসহ শত শত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। একাধিক জালিয়াতচক্র ওই জমি জোরপূর্বক দখল করে রাখে। কারসাজি করে চক্রের অন্তত তিনজনকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও করা হয়, যাঁরা বিগত দিনে ট্রাস্টের সম্পত্তি দখলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁরা হলেন তাজ মোহাম্মদ, বাহাউদ্দিন ও নাজির। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাঁদের সহযোগিতায়ই ট্রাস্টের সম্পত্তি খাসজমি হিসেবে রেকর্ড করা হয়। তাঁরা ওই জমি খাস দেখিয়ে জেলা প্রশাসন থেকে একসনা ইজারা আনার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

একাধিক ট্রাস্টি কালের কণ্ঠকে জানান, ১৯৮০ সালের দিকে দাতব্য হাসপাতালের বেশির ভাগ সম্পত্তি খাসজমি হিসেবে ঢাকা জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড হয়। এই রেকর্ড সংশোধনের উদ্যোগ নেয় ট্রাস্টি বোর্ড। কিন্তু জালিয়াতচক্রের কারসাজির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সে রেকর্ড সংশোধন করা সম্ভব হয়নি। নিম্ন আদালতে একাধিক মামলা করা হলেও আদালত তা খারিজ করে দেন। ২০০৩ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে এ-সংক্রান্ত মামলা খারিজ হলে সেই আদেশের বিরুদ্ধে দুটি আপিল করা হয়। সাক্ষ্য ও দালিলিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত গত ১ মার্চ আগের আদালতের দেওয়া দুটি রায় বাতিল করে রাধাগোবিন্দ পাল ট্রাস্টের সম্পত্তির রেকর্ড তাঁদের নামে সংশোধন করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ১৯২০ সালের জগমোহন পালের উইল অনুযায়ী রাধাগোবিন্দ ট্রাস্টের সমুদয় সম্পত্তি অবমুক্ত করে রায় দেন।

ট্রাস্টের বর্তমান রিসিভার অ্যাডভোকেট খন্দকার আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, হাসপাতালের বেশির ভাগ জমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখল রয়েছে। সম্প্রতি কিছু জমি উদ্ধার করে সেখানে হাসপাতাল ভবন তৈরি করা হয়েছে, যা অচিরেই চালু করা হবে। তবে ট্রাস্টের অবশিষ্ট জমি উদ্ধারের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তা চলছে। দখলদারদের মধ্যে যদি কাউকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য করা হয়ে থাকে তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্রাস্টি বোর্ডের একাধিক সদস্য জানান, রায়ের কপি হাতে পেলেই এসি ল্যান্ড অফিসে রেকর্ড সংশোধনের জন্য মিস কেস দায়ের করা হবে। এরপর খাজনা পরিশোধ ও নামজারি করে দখলদার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বনগ্রামের বাসিন্দা রঞ্জন কুমার চক্রবর্ত্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অর্থের অভাবে যারা অন্য কোথাও চিকিৎসা নিতে পারত না তাদের কাছে হাসপাতালটি ছিল ত্রাণকর্তার মতো। অথচ সেই রাধাগোবিন্দ পাল দাতব্য চিকিৎসালয় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে অবৈধ দখলদারদের কারণে। হাসপাতালটির প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত স্থাপনা আর কাঁচাবাজার। ’


মন্তব্য