kalerkantho


বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল কাল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল কাল

বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল আগামীকাল শনিবার। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সকাল ১০টায় কাউন্সিলের উদ্বোধন করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। অনুষ্ঠানে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যও দেবেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে দল সুসংগঠিত করতে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য যেমন থাকবে, তেমনি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী দিনে দলীয় অবস্থানও তিনি তুলে ধরবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার বক্তব্য ছাড়াও লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য দেবেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এদিকে কাউন্সিল আয়োজনের সব প্রস্তুতিই শেষ পর্যায়ে। প্রায় তিন হাজার কাউন্সিলর থাকছেন অনুষ্ঠানে। কাউন্সিলর, প্রতিনিধি, আমন্ত্রিত অতিথি ও উত্সুক নেতাকর্মী সব মিলিয়ে ৩০ হাজার মানুষ কাউন্সিলে উপস্থিত থাকবে।

গতকাল কাউন্সিল ভেন্যুতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরোদমে চলছে মঞ্চ ও আগতদের বসার স্থান তৈরির কাজ। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ভেতরের চত্বরে কেবল কাউন্সিলর ও আমন্ত্রিত অতিথিদের বসার ব্যবস্থা থাকবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে বসবেন প্রতিনিধিরা। গতকাল দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার পর প্রতিনিধিসহ অন্যরা কোথায় বসবেন, সেই সংকটও কেটে গেল।

শনিবার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া কউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হবে মধ্যাহ্ন ভোজের মধ্য দিয়ে। এরপর বিকেল ৩টা থেকে শুরু হবে রুদ্ধদ্বার কাউন্সিল। এতে আলোচ্যসূচিতে রয়েছে শোক প্রস্তাব উপস্থাপন, দলের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনে গঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির রিপোর্ট পেশ, মহাসচিবের সাংগঠনিক প্রতিবেদন পেশ, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা, দলের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র সংশোধন।

কাউন্সিল উপলক্ষে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও ভিড় জমেছে নেতাকর্মীদের। কার্যালয়ের তৃতীয় তলা থেকে বিতরণ করা হচ্ছে কাউন্সিলর কার্ড। কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, বরাদ্দের চেয়ে বেশি ডেলিগেট কার্ড সংগ্রহের জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতারা এবং বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা হন্যে হয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। কার্ড বিতরণের দায়িত্বে থাকা নেতাদের কাছে তদবির করছেন নানাভাবে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের দৃশ্যও পাল্টে গেছে। পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে কার্যালয়ের আশপাশ। কারাবন্দি ও সিনিয়র নেতারা ছবিসংবলিত বিশাল বিশাল ব্যানার টানিয়ে কাউন্সিলকে স্বাগত জানাচ্ছেন। পাঁচ তলাবিশিষ্ট কার্যালয় ঢেকে গেছে এমন ব্যানারে। এতে লেখা রয়েছে, এবারের কাউন্সিলের মূল প্রতিপাদ্য ‘মুক্ত করবোই গণতন্ত্র। ’ প্রতিটি ব্যানারে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিকৃতিও স্থান পেয়েছে।

বিএনপির কাউন্সিলের এবারের মূল স্লোগান—‘দুর্নীতি দুঃশাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ। ’ কাউন্সিল উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তৈরি হয়েছে লোগো, ওয়েবসাইট ও থিম সং। কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে বিএনপির অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো স্লোগান ঠিক করেছে যুবদল—‘তারুণ্যে যারা অকুতোভয়, তারাই আনবে সূর্যোদয়’, কৃষক দল—‘ফলাবো ফসল, গড়বো দেশ, গণতন্ত্রে বাংলাদেশ’, মুক্তিযোদ্ধা দল—‘মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র, মুক্ত করো গণতন্ত্র’, শ্রমিক দল—‘শ্রম দিয়ে শিল্প গড়বো, দেশের আঁধার ঘুচিয়ে দেবো’, মহিলা দল—‘চেতনায় নারী, বিপ্লবে নারী, গণতন্ত্র ফেরাতে আমরাই পারি’, ছাত্রদল—‘বাঁচতে চাই, পড়তে চাই, দুর্নীতিমুক্ত দেশ চাই’, স্বেচ্ছাসেবক দল—‘আলোর দিন দূরে নয়, করতে হবে আঁধার জয়’, জাসাস—‘গাইবো মোরা গণতন্ত্রের গান, দুঃশাসনের হবেই অবসান,’ তাঁতী দল—‘শক্ত হতে বাঁধো তাঁত, কাটাতে হবে আঁধার রাত’, মৎস্যজীবী দল—‘জালের টানে ঘুচবে আঁধার, বাংলাদেশ সবার’ এবং উলামা দল—‘জিয়ার আদর্শে দেশ গড়বো, ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখবো’।

তৃণমূলে নতুন আশা : ষষ্ঠ এই কাউন্সিল ঘিরে দলের সর্বস্তরে নতুন করে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় আছে সবাই। দলের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও দক্ষ নেতাদের জায়গা হবে কেন্দ্রীয় কমিটিতে এমন আশায় বুক বেঁধেছেন অনেক নেতাকর্মী। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও বলছেন, কাউন্সিলের পরে মাস খানেকের মধ্যে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে কমিটি ঘোষণা করবেন, তাতে নবীন-প্রবীণের সমন্বয় থাকবে। দীর্ঘ ছয় বছর পর কাউন্সিল হওয়ায় কমিটির কলেবরও বাড়বে। গঠনতন্ত্র সংশোধনে নানা প্রস্তাব এসেছে। গত বুধবার রাতে এসব নিয়ে দলের সর্বোচ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছেন খালেদা জিয়া।

সোহরাওয়ার্দীর অনুমতি পেল বিএনপি : জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের জন্য ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার বিকেলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

জানা গেছে, বিএনপির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন ছাড়াও এর সামনের প্রাঙ্গণ, পূর্বদিকের সামনের সড়ক, সেমিনার হল, পেছনের মাঠ অর্থাৎ নতুন ভবনের সামনের মাঠও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কেবল টেনিস মাঠটি ছাড়া আশপাশের পুরো জায়গাই বিএনপি ব্যবহার করতে পারবে।

কোনো বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা নেই—ফখরুল : আগামী ১৯ মার্চ ষষ্ঠ কাউন্সিল সফল করতে সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছে বিএনপি। কাউন্সিল নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলার আশঙ্কাও করছে না দলটি। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণ সরেজমিনে দেখার পর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন।

ফখরুল বলেন, ‘১৯ মার্চ শনিবার বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই কাউন্সিল উপলক্ষে সারা দেশে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ব্যাপক আলোড়ন জেগেছে। পুনরায় জেগে ওঠার জন্য এই কাউন্সিল যে একটা অনন্য ভূমিকা রাখবে সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। এখন আমরা আশা করব, সরকারের সম্পূর্ণ সহযোগিতা দরকার এই কাউন্সিল অনুষ্ঠানের জন্য। ’

কাউন্সিলকে নিয়ে কোনো স্যাবোটাজের আশঙ্কা করছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এ ধরনের কোনো আশঙ্কা আমরা করছি না। আমরা আশা করি, আমাদের নেতাকর্মী যাঁরা আছেন, তাঁরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এই কাউন্সিল সফল করার চেষ্টা করবেন। ’

দুপুর ১২টার দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আ স ম হান্নান শাহ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, আবদুল আউয়াল মিন্টু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা মিজানুর রহমান সিনহা, আবদুস সালাম, গিয়াস কাদের চৌধুরী, আফরোজা আব্বাস, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবদুল মজিদ, সাংবাদিক শফিক রেহমান প্রমুখ নেতা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের ভেতরে বৈঠক করেন। পরে তাঁরা ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণ সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুল হক মিলন, খায়রুল কবীর খোকন, নাজিমউদ্দিন আলম, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সানাউল্লাহ মিয়া, আবদুস সালাম আজাদ, শামীমুর রহমান শামীম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কাউন্সিলের কর্ম অধিবেশনে প্রায় দুই হাজার ৮০০ কাউন্সিলরের কিভাবে আসন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই মিলনায়তনে আসনসংখ্যা মাত্র ৮০০।

এর আগে সকালে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আপ্যায়ন উপকমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির আহ্বায়ক আবদুস সালাম জানান, কাউন্সিলে আমন্ত্রিত কাউন্সিলর, প্রতিনিধি ও নেতাকর্মীদের জন্য দুপুরে পুরান ঢাকার বিখ্যাত ‘মোরগ-পোলাও’ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজধানীর চার জায়গায় এই খাবার রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সুশৃঙ্খলভাবে খাবার বিতরণের জন্য জেলাভিত্তিক নেতাদের নিয়ে ১৯টি কমিটি করে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

সালাম বলেন, ‘কাউন্সিলের দিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল প্যান্ডেলে কাউন্সিলর, আমন্ত্রিত দেশ-বিদেশের অতিথি, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। ডেলিগেটসহ সবাইকে বাইরে বিভিন্ন জায়গায় আসন নিতে হবে। দলের কাউন্সিলকে সফল করতে আমরা নেতাকর্মীদের সবার সহযোগিতা চাচ্ছি। ’

এই সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতা আসাদুল হাবিব দুলু, হারুনুর রশীদ, রফিক শিকদার, মহানগর নেতা কাজী আবুল বাশার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আন্দোলনে ব্যর্থতা সব কেন্দ্রীয় নেতার : দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় দলটির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একটি ভিডিও গানের অ্যালবামের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘বিগত আন্দোলনে কর্মীদের কোনো ব্যর্থতা নেই। আমরা যে যত বড় বড় নেতা বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ব্যর্থতা তত বেশি। ’

কাউন্সিল প্রসঙ্গে গয়েশ্বর চন্দ্র বলেন, ‘গণতন্ত্র ফেরাতে আমরা কী ভাবছি, কাউন্সিলে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। কাউন্সিলের দিকে সারা দেশের নেতাকর্মীরা তাকিয়ে রয়েছে। সুতরাং কাউন্সিলেই তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ’


মন্তব্য