kalerkantho


সরকারি বিদ্যালয়ে বেসরকারি চাকুরে

শরীফুল আলম সুমন   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সরকারি বিদ্যালয়ে বেসরকারি চাকুরে

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয়করণ করা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৪ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়েছে। ফলে সরকারি বিদ্যালয়ে বেসরকারি চাকরি করতে হচ্ছে তাঁদের।

বেতন-ভাতাও পাচ্ছেন না তাঁরা।

২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। সে ঘোষণা তিন বছরেও পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। কবে হবে বলা কঠিন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সেগুলোর এক লাখ তিন হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষকের চাকরি তিন ধাপে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম ধাপে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে, দ্বিতীয় ধাপে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এবং তৃতীয় ধাপে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয়করণ করা হবে বলে ঠিক করা হয়। প্রথম ধাপে ২২ হাজার ৯৫৬টি বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণের গেজেট প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে; মে মাসে শিক্ষকদের চাকরি সরকারি করা হয়। এর পরই দেখা দেয় জটিলতা। ২০১৩ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয় ধাপে দুই হাজার ২৫২টি স্কুল এবং ২০১৫ সালের জুলাইয়ে তৃতীয় ধাপে ৫৫৭টি স্কুল জাতীয়করণ করা হয়।

কিন্তু এসব স্কুলের প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারি হয়নি এখনো।

তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জাজরীন নাহার বলেন, ‘নানা জটিলতায় দ্বিতীয় ধাপের শিক্ষকদের চাকরি সরকারীকরণের গেজেট প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে ইতিমধ্যে আমরা জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পেয়েছি। এখন পদ সৃষ্টির সারাংশ সচিব কমিটিতে পাঠাতে হবে, তাদের অনুমোদন লাগবে। এ-সংক্রান্ত ফাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কিছু কাজও বাকি রয়েছে। তৃতীয় ধাপে জাতীয়করণ করা স্কুলগুলোর জন্য পদ সৃজনের ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। ’

নাম প্রকাশ না করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম ধাপের প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষকের চাকরি চার মাসের মধ্যে জাতীয়করণ করা হয়। একইভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করাও সম্ভব ছিল। কিন্তু এসব স্কুলের পক্ষে প্রথম ধাপের স্কুলগুলোর মতো তদবিরের লোক ছিল না। আর মন্ত্রণালয়ও মনে করেছে, ২৩ হাজার স্কুলের কাজ শেষ হয়েছে মানে সবই হয়ে গেছে। ফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের স্কুলগুলোর সব কাজেই দেরি হয়েছে। মাঠপর্যায় থেকে রিপোর্ট আসা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পদ সৃষ্টি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আদায়—প্রতিটি কাজেই ঢিলেমি হয়েছে। এখন সচিব কমিটিতে যাবে। এ ক্ষেত্রেও ধীরে চলো নীতিতে কাজ হচ্ছে। ’

শিক্ষকরা জানান, প্রথম ধাপে স্কুল জাতীয়করণের চার মাসের মধ্যেই প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারি করা হয়। দ্বিতীয় ধাপেও সেভাবেই হওয়ার কথা। কিন্তু প্রায় আড়াই বছরেও এ ধাপের শিক্ষকদের চাকরি সরকারি হয়নি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে জাতীয়করণ করা স্কুলগুলো মূলত কমিউনিটি স্কুল; এগুলো এনজিও, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের অধীনে ছিল। আগে অল্প হলেও বেতন পাওয়া যেত। জাতীয়করণের পর বেতন-ভাতাই বন্ধ হয়ে গেছে।

মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর চৌকিদারকান্দি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, ‘খুবই কষ্টে আছি। জাতীয়করণের পর প্রায় আড়াই বছর ধরে বেতন নাই। পরিবার নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছি। নানা জায়গায় খোঁজ নিই। সবাই বলে এই তো হবে। কিন্তু হচ্ছে না। আর পারছি না। ’

সদ্য বিলুপ্ত বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের মহাসচিব মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘শিক্ষকদের বেতন খুবই কম। টেনেটুনে সংসার চালান তাঁরা। এখন বেতন-ভাতাই নেই, হাজার হাজার শিক্ষক দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। ’

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রথম ধাপের ১৫০টি, দ্বিতীয় ধাপের ১০৫টি এবং তৃতীয় ধাপের ৪১৩টি স্কুলের জাতীয়করণ এখনো হয়নি। জমি নিয়ে জটিলতা, বৈধ কাগজপত্র না থাকা, ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া, শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা প্রভৃতি কারণে এগুলোর জাতীয়করণ আটকে আছে। সমাধান খোঁজা হচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হুমায়ন খালিদ বলেন, ‘২৬ হাজার স্কুল জাতীয়করণ করতে গিয়ে নানা সমস্যা ধরা পড়ছে। সেসবের সমাধান করেই কাজ করতে হচ্ছে। যেসব স্কুলের জাতীয়করণ একেবারেই সম্ভব নয় সেগুলোর তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকে যেভাবে বলা হবে সেভাবেই সমাধান করা হবে। ’ তিনি জানান, যেসব স্কুলের জাতীয়করণের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের গেজেট দ্রুত প্রকাশের জন্য কাজ চলছে।


মন্তব্য