kalerkantho


ইউপি নির্বাচনে চিফ হুইপ ও সচিবের দ্বন্দ্ব

রফিকুল ইসলাম ও এমরান হাসান সোহেল, বাউফল থেকে   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইউপি নির্বাচনে চিফ হুইপ ও সচিবের দ্বন্দ্ব

সভাকক্ষ তখন কানায় কানায় পূর্ণ। জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, সুধীসমাজ আর প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার অংশগ্রহণ উপজেলার আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটির সভাকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলছিল। সেখানকার পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় ছিল না, আগের দিন (৭ মার্চ) ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আশ্রাব আলী দলীয় কোন্দলের জেরে নির্বাচনী সহিংসতায় খুন হয়েছেন। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের হাত ঘুরে মাইক যখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের হাতে তখনই ঘটে বিশৃঙ্খলা। খুনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি অংশ জড়িত—তাঁর এমন বক্তব্যে বিব্রত সভায় আগতরা। উপজেলা চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মজিবুর রহমান তখন চেয়ার চাপড়ে ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তাৎক্ষণিক আরেক পক্ষ ক্ষিপ্ত হয়ে সভাকক্ষেই তাঁকে লাঞ্ছিত করে।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে ৮ মার্চের এ ঘটনা পুরনো। সেই ঘটনার রেশ এখন পুরো ইউপি নির্বাচনে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী দলের মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে একই আচরণ করছেন। প্রচার-প্রচারণায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজের এলাকায় এমন সব ঘটনার নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেল।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মালেক হুইপের প্রতিবেশী। আগামী দিনে তিনি জাতীয় নির্বাচনে আসছেন—এমনটি জানে বাউফলবাসী। কিন্তু এখন থেকেই তিনি হুইপবিরোধী আওয়ামী লীগের একটি বিরাট অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নেপথ্যে থেকে। তবে বাউফল উপজেলা চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মজিবুর রহমান ও পৌরসভার মেয়র জিয়াউল হক জুয়েল সচিবের হয়ে মাঠ গোছাচ্ছেন।

উপজেলার রেশ এখন ইউনিয়নে : কনকদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান হিরন ৮ মার্চ আইনশৃঙ্খলা সভায় যোগ দিতে উপজেলা পরিষদে যান। তাঁর ওপর উপজেলা পরিষদেই হামলা চালান আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শাহীন হাওলাদার ও তাঁর লোকজন। এ সময় দৌড়ে প্রাণে রক্ষা পেলেও  ভাঙচুর করা হয় হিরনের মোটরসাইকেলটি। ১০ মার্চ কনকদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব জাফরাবাদ এলাকায় গণসংযোগের সময় হিরনের তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ে যায় শাহীনের লোকজন। ১২ মার্চ হোগলা এলাকায় মাইকিংয়ে বাধা দেওয়া হয়। ১৩ মার্চ বীরপাশা এলাকায় হিরনের পোস্টার লাগাতে বাধা দেয় শাহীনের লোকজন।

কনকদিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান হিরন দাবি করেন। ওই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহীন হাওলাদার ও বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার হোসেন জাহাঙ্গীর এক হয়ে কাজ করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরনকে রুখে দিতে তাঁদের দুজন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন এভাবে—‘হয় ভোট আওয়ামী লীগে দাও নয় ভোট বিএনপিকে দাও’। তিনি দাবি করেন বিএনপির প্রার্থীর বাড়ির পাশের ভোটকেন্দ্র নারায়পাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ। সব ধরনের নির্বাচনে সহিংসতা ঘটে কলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, ফলে এই কেন্দ্রও ঝুঁকিপূর্ণ। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বাড়ির পাশে হওয়ায় হোগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রটি ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী না থাকার কারণে বীরপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সহিংস ঘটনা ঘটাতে পারেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এ ছাড়া জয়ঘোড়া দাখিল মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে মজিবর দারোগা নামের এক ব্যক্তির আতঙ্ক কাজ করছে ভোটারদের মধ্যে। এসব কথা জানিয়ে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি নির্বাচনের দিন ব্যাপক সহিংসতা ও গোলযোগের আশঙ্কা করে তাঁর ইউনিয়নের অন্তত পাঁচটি কেন্দ্রে রিজার্ভ বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেট পাঠানোর আবেদন করেছেন।

১৪ মার্চ কাছিপাড়া ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাফিজুর রহমানের ওপর দুপুরে হামলা চালান আওয়ামী লীগ প্রার্থী রফিকুল ইসলাম ও তাঁর লোকজন। প্রতিদিন বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ওপর চালাচ্ছেন হামলা। কখনো দেওয়া হচ্ছে গণসংযোগ ও মাইকিংয়ে বাধা, আবার কোথাও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে, ঘটাচ্ছে সহিংস ঘটনা। সহিংসা বাধা দেওয়ার নানা ঘটনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা থানা কিংবা নির্বাচন কার্যালয়ে অভিযোগ করলে সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো সারা মেলে না।

সূর্যমনি ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বাচ্চুর বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর এন্তার অভিযোগ। স্থানীয়রা জানায়, ছোটবেলা থেকেই সন্ত্রাসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন বাচ্চু। এ কারণে ইউপি নির্বাচনে একসময় সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সম্মানজনক ভোট অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু গত ইউপি নির্বাচনে তাঁকেই চেয়ারম্যান প্রার্থী করেন হুইপ ফিরোজ। অভিযোগ আছে, দলীয় প্রভাবে কেন্দ্র দখল করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২২ মার্চের নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ভোট হলে তাঁর পাস করা সম্ভব নয় জেনে তিনি শুরু করেছেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

৮ মার্চ সন্ধ্যায় ইউনিয়নের নুরাইনপুর বাজারে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে তাঁর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি দল প্রতিপক্ষ জসীম ফরাজির সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক আর ভীতি তৈরি করতে জসীমের সাঁটানো বিভিন্ন এলাকার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলাসহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছেন। ভোটের দিন পশ্চিম ইদ্রোকুল ইউনিয়ন পরিষদ, পূর্ব ইদ্রোকুল ভোটকেন্দ্র দখল করে সকাল ১০টার মধ্যে নির্বচান শেষ করে দেবেন বাচ্চু, এমন অভিযোগ জসীমের।

ধুলিয়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনিচুর রহমান হাওলাদারের (আব্দুর রব) প্রচার-প্রচারণা ছাড়া অন্য প্রার্থীদের কোনো তৎপরতা নেই। ২৩ ফেব্রুয়ারি মনোনয়ন বাছাইয়ের দিন রিটার্নিং অফিসারের সামনে বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল জব্বার মৃধার সমর্থনকারী ইমাম হোসেন তালুকদারকে রব নিজ হাতে মারধর করেন। ওই দিন বাড়ি ফেরার পথে ধুলিয়া ইউপির ঝাউতলা খেয়াঘাট এলাকায় রব তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে সশস্ত্র হামলা চালায়। তখন আটটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরসহ অগ্নিসংযোগ করে। একই সঙ্গে জব্বারের ১৭ কর্মীকে কুপিয়ে জখম করে।

এ ঘটনায় উল্টো জব্বারের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগে বাউফল থানায় মামলা করা হয়।

সচিবের ভাই বঞ্চিত : এম জামান আহমেদ, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এই পরিচয়ে তিনি এলাকায় যতটা না পরিচিত, তার চেয়েও সচিবের ভাই হিসেবেই পুরো জেলায় পরিচিত। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মালেকের ছোট ভাই তিনি। আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য। তবে সচিবের ভাই এই পরিচয়ের কারণে এবার দলীয় মনোনয়ন পাননি তিনি। মনোনয়ন পেয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজের অনুসারী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব হাওলাদার। তিনি জোড়া খুন মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সেই ক্ষোভে জামান এবার নির্বাচনে আসেননি।

ঘোড়া বনাম নৌকা : প্রকৌশলী দলীয় সমর্থন নিয়ে পরপর দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। দুবারই তাঁর নির্বাচনী প্রতীক ‘ঘোড়া’ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় প্রার্থীর বাইরে গিয়ে তিনি দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, কিন্তু দলীয় মনোনয়ন পাননি এমন ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এসব প্রার্থীর প্রতীক ঘোড়া। এমনকি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শহীদুল আলম তালুকদারের ভাই কেশবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তছলিম তালুকদার এই ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। সেখানে আওয়ামী লীগের কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। আওয়ামী লীগের একটি অংশ তাঁর পক্ষেই কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই পরিবারের তিনজন : উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব হাওলাদার। হুইপের খুব ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় তিনি বগা ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তাঁর ছেলে মহমুদ হাসান এবং ছোট ছেলে হাসিবুর রহমান। তাঁরাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন। চেয়ারম্যান পদে একই পরিবারের তিন প্রার্থীর ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, বগার দুই শিক্ষক হত্যা মামলায় আব্দুল মোতালেব হাওলাদার ও তাঁর বড় ছেলে মহমুদ হাসানের ডাবল যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল। মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।


মন্তব্য